অদ্বৈত

অন্তরে কি দুজনে সমান? দেখতেই যা আলাদা? জীবনে, গণিতে, সাহিত্যে, এই প্রশ্নটা আমাদের প্রায়ই খোঁচা দিয়ে যায়। ১৮০০ সালের জ্যাকোবাইট, ১৯০০ সালের নারোদনিক আর ২০০০ সালের মাওবাদী কি একই মানুষ। শুধু আকারে ভিন্ন? ফাউস্ট আর গোরা কি
একই উপন্যাস? ‘একই’ কথাটার অর্থই বা কি? কতটা নির্দিষ্ট করে দুটো পৃথক বস্তুকে ‘এক’ বলা যায়? ‘পৃথক’ কথাটার অর্থই বা কি?

গণিতে পঁনকেয়ার সায়েব এই প্রশ্নটা নিয়ে ভেবেছিলেন। একটা (ফাঁপা) গোলক আর একটা (ফাঁপা) টোরাস কি একই বস্তু? একটা কি বাঁকিয়ে চুরিয়ে, টেনে, চেপ্টে দিয়ে, আরেকটায় পালটে ফেলা যায়?

Continue reading “অদ্বৈত”

স্নেহলতা

এই যে আঙুলের আগায়,
তিরতির করে কাঁপছে সময়।
নৌকায় বসে আছো তুমি।
তোমার রোগ।
আর অজস্র সুসময়।
তারপরই লণ্ডভণ্ড দেহ,
পারিজাতের মত সুপ্রতিম।
তীরের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা স্নেহ,
হিজল নদীর মতই আরক্তিম।

বৃষ্টি নামল যখন

When it started to rain, I was alone in the porch,
I ran. I thought I would find you in the water.
I thought that you might be soaked in the cloud,
Or the rain. Beneath the shiuli tree’s bosom.
Soaking your hair.. oh… in sky wrenching water…
But you were not to be found.
Not outside in the rain.
My heart is clouded again…
And it is raining like the end of times. Inside.

(A feeble attempt to translate Shakti Chattapadhayay’s second verse from বৃষ্টি নামল যখন)

ইকারাস, ওটেন আর রাজবিদ্রোহী

ক্রিট দেশের রাজা বল্লেন, একটা মস্ত জেলখানা চাই। দায়দালুস তো বিশ্বকর্মা। রাজার হুকুম মত সেই বানালে এক গভীর সুড়ঙ্গের মধ্যে দুর্ভেদ্য কারাগার। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস! রাজা সেই দায়দালুসকেই কারাগারে বন্দী করে রাখলে। নিজেরই বানানো জেলখানায় বন্দী হলেন দায়দালুস। সাথে তার ছেলে ইকারাস।

Continue reading “ইকারাস, ওটেন আর রাজবিদ্রোহী”

আমরা যা চাই

অর্জুন বললেন, ‘আমি কি করে তোমায় ত্যাগ করতে পারি?’ সমস্ত পৃথিবী যেন থরথর করে উঠল। জলে বৃষ্টির প্রথম বিন্দু টুপ করে ঝরে পড়লে যেমন কম্পন হয়, তেমনি। আমরা চাই তেমন বিন্দু বিন্দুতে শিহরিত হতে। আমরা পারি না।

আমাদের অন্তরে শ্বাসের মুল্য কি কমে আসছে? সেই ফরাসি যুবকের মত আমারও বলতে ইচ্ছে করে, ‘কোনো ভয় নেই। ভারতে এসো!’ সমস্তটা বিক্রির জন্য নয় বাবুমশাই।

আমরা বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। বন্ধুর গর্ভে কে যেন আসছে। আচ্ছা এই সেদিন বিপ্লব হবে বলেছিলে না? যোধপুর পার্কে একটা মস্ত মিটিং হয়েছিল। ফ্রক পড়া এক কৃষ্ণকাজল মেয়ে এসেছিল। আকাশে সেদিন মেঘ ছিল না। বিপ্লব হবে। পূ্র্বাভাস ছিল।


সেদিনও কলেজ স্কোয়ারের ফুটপাতে ফিরদৌসদার সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। ফেভারিটে কৌশিক আসবে বলে যথারীতি লেট। অসম্ভব বৃষ্টিতেও ৭২ নম্বর বাস ঠিক সময়ে কলেজ স্ট্রিট! আর আমি যথারীতি দৌড়াচ্ছি। কোন এক লহমায় মহাজাতি সদন মিলিয়ে গেল বাঁ হাতে।
কি হবে সখি এমন যাতনা? এমন অবুঝ হয়ে থাকব কতক্ষণ। পকেটে পাঁচ টাকা আছে বোধহয়। বইমেলা ফেরত আমি নিশ্চিত, এই ফকিরি দিয়ে বাংলাতে প্রেম, বিপ্লব দুইই হয়।


আর দুইই হয়ে গেছে।

চুরুট

হঠাৎ শখ চেপেছে চুরুট খাওয়ার। ওকল্যাণ্ড এভিন্যুর ওপর একটা মস্ত দোকান দেখেছিলাম। আরব দেশিয় বিপণী। ভেতরে হুঁকো, সিগার এসমস্ত রাখা। সেখানেই হানা দিলাম।

Continue reading “চুরুট”

তুষারমৌলি

বাসে করে যাচ্ছিলাম মে-ফেয়ার মল। শহরের এক প্রান্তে ওয়াওয়াটোসা। মঙ্গলবার করে সেখানে হাফ দামে সিনেমা দেখা যায়। গাইডের সাথে আলোচনা শেষ করতে করতে দুপুর ১টা হলো। তারপর ৬০ নাম্বার বাস ধরেছি। আজ একটা কিছু দেখতেই হবে। অনেকদিন স্বাদবদল হয় না।

Continue reading “তুষারমৌলি”

ধর্মপাল

চন্দ্রগর্ভ ২১ বছর বয়েসে জাহাজে উঠলেন। গন্তব্য সুমাত্রা। সেখানে ধর্মপাল থাকেন। বৌদ্ধ শাস্ত্রের কিংবদন্তী পণ্ডিত ধর্মপালের কাছে শিখতে চান চন্দ্রগর্ভ। বিগত একদশক ধরে তিনি বিক্রমশীল মহাবিহারে পড়াশোনা করেছেন। তবু পিপাসা মেটেনি।

এলাহাবাদের নাম পালটে গেল। প্রয়াগরাজ। বৌদ্ধধর্ম, ইসলাম পেরিয়ে ভারতে এখন অন্য এক ধর্মের রণহুঙ্কার শোনা যাচ্ছে। সমসময়ের ধর্মপাল, অশোক সেন প্রয়াগরাজে থাকেন। তিনি সৃষ্টিরহস্যের কিছু কথা নাকি জানেন। কলকাতায় থাকেন অধ্যাপক নীনা গুপ্তা। শুনেছি তিনি নাকি শুন্যের কথা জানেন (নিলপোটেন্সি উবাচ)। মুম্বাইতে থাকেন মহান মহারাজ। আধুনিক ভারতের ধর্মপালদের কাছে ধাবিত হচ্ছে উন্নাসিক মন।

আর মাঝে মাঝে মনোযোগ ছিন্ন হচ্ছে চন্দ্রগর্ভ।

২১ বছরের চন্দ্রগর্ভ নাকি বাঙাল। মতান্তরে ভাগলপুরের ছেলে। সুমাত্রা পৌঁছেই তিনি ধর্মপালের কাছে ছোটেননি। বরং কিছুকাল সেখানে মাস্টারি করে দিন কাটিয়েছেন। ভারতে তখন বৌদ্ধধর্ম রাজ অনুগ্রহ থেকে বিচ্ছিন্ন। সহস্র বছরের পঠনকেন্দ্রগুলি ভেঙে পড়বে। সাথে যাবে কিছু অচলায়তন আর অনেকখানি নিবদ্ধতা।

অথচ মস্তিষ্ক সে কথা মানতে চায় না। এ যেন ১৯৩০ এর জার্মানি। গটিনজেন ছাড়ছেন পণ্ডিতশ্রেষ্ঠরা। তবু মন মানতে চাইছেনা। কর্মভুমিই তো মানুষের ঘর। এতদিনের বাউহাউস, এতকালের বনস্পতি, এতকালের যত্নে লালিত ডিপার্টমেন্ট সেসব ছেড়ে যেতে হবেই কোন ভিন্ন দেশে। আইনস্টাইন অবশ্য খলিফা আদমি। নাগরিকত্ব ছেড়েছেন কিছুকাল আগেই। চন্দ্রগর্ভও দেশ ছাড়বেন। তবে তার আগে তিনি ফিরবেন সুমাত্রা থেকে। দেখবেন রাজাকে তন্ত্রমন্ত্রের অন্ধকারে তলিয়ে যেতে। টের পাবেন যে গোটা দেশ আচ্ছন্ন হতে চলেছে ক্ষমতালিপ্সুদের হানাহানিতে। তারপর দেশ ছাড়বেন তিনি।

ধর্মপাল কি শিখিয়েছিলেন ২১ বছরের চন্দ্রগর্ভকে? জানিনা। তেমন আগ্রহও নেই। অশোক সেন কি শেখাতে পারেন? প্রচুর আগ্রহ আছে। কিন্তু সেই পঠনের প্রস্তুতি নেই। বাইরে অন্ধকার নামছে। হৃদয়ে ফরাসি গণিতবিদ সের বিচরণ করছেন। গ্রথেনডাইক পায়চারি করচেন। তাদের ঘরে প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য সহস্র বছরের বটবৃক্ষ, সেই চঞ্চলমতি যুবকের কাছে আমিও ভিক্ষুবৃত্তি নিয়েছি। দেশে ক্রমশ: দানবদের রণহুঙ্কার তীব্র হচ্ছে। উঠানে পরাধীন দেশের এক রাজবিদ্রোহী কুচকাওয়াজ করছেন।

চন্দ্রগর্ভ আপাতত অতীশ হওয়ার প্রতীক্ষায়।