বাসে করে যাচ্ছিলাম মে-ফেয়ার মল। শহরের এক প্রান্তে ওয়াওয়াটোসা। মঙ্গলবার করে সেখানে হাফ দামে সিনেমা দেখা যায়। গাইডের সাথে আলোচনা শেষ করতে করতে দুপুর ১টা হলো। তারপর ৬০ নাম্বার বাস ধরেছি। আজ একটা কিছু দেখতেই হবে। অনেকদিন স্বাদবদল হয় না।

এই বাসটায় সচরাচর চড়ি না। শহরের একটু অন্য অঞ্চল দিয়ে বাসটা যাচ্ছে। এদিকে বাড়ি ঘর কিছুটা মলিন। রাস্তাঘাট কিছুটা ভাঙ্গা। দারিদ্রের একটা ছাপ সুস্পষ্ট।

বাসের অধিকাংশ যাত্রি কৃষ্ণাঙ্গ। এখানে এসে অবধি দেখেছি, বাসে কৃষ্ণাঙ্গরা থাকলেই বেশ একটা হইহই ব্যাপার হয়। ওরা একে অপরের সাথে কথা বলে। হো হো করে হাসে। তুলনায় শ্বেতাঙ্গরা মৃদুভাষী। যেন খানিক থম মেরে আছে।

মিলওয়াকি শহরে কৃষ্ণাঙ্গরা কয়েকটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে বাস করে। একে হাউসিং সেগ্রিগেশন বলে। যেমন কলকাতায় হিন্দু আর মুসলমানদের পাড়া ভিন্ন, এখানেও খানিকটা তেমন। তবে এদের একটা চেষ্টা আছে এই ব্যবস্থা পালটে দেওয়ার। তার জন্য আইন, কানুন, সিনেমা, আন্দোলন সবই আছে।

বাইরে -৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস। তিন – চার পরত পোষাক আর মোটা কোট ছাড়া বেরুনোই যায় না। মে ফেয়ার মল বেশ বড়। ছড়ানো ছিটানো। তবু আমাদের দেশের শপিং মল গুলোর তুলনায় বেশ ছোট। এখানে মল কালচার শেষের দিকে। গত বছরই নাকি বহু মল বন্ধ হয়ে গেছে। তার বদলে উঠে আসছে ছোট ছোট দোকান। এমনকি বইএর দোকানেরও নাকি একটা প্রত্যাবর্তন ঘটছে।

দোতলা শপিং মল। দ্বিতীয় তলে সিনেমা হল। আঠারোটা স্ক্রিন আছে। এত বড় মাল্টিপ্লেক্স দেশে দেখিনি। হাফ দামে টিকিট কিনলাম। ছয় ডলার। প্রায় চারশো কুড়ি ভারতীয় টাকা। পপকর্ন আর কোকাকোলা নেওয়া হল। ভেবেইছিলাম লাক্সারি করব। সেও ছয় ডলার। তারও হাফ দাম। সিনেমার নাম ‘ডার্ক ওয়াটার্স’। কেমিক্যাল কোম্পানি দুপন্টের বিরুদ্ধে এক আইনজ্ঞর লড়াইএর গল্প। সত্যি ঘটনা নিয়ে লেখা। ‘টেফলন’এ নাকি বিষ আছে। আমেরিকা সহ বহু দেশে এ নিয়ে লড়াই হচ্ছে। এর থেকে বিবিধ রকমের ক্যান্সারও হয়। অথচ আমাদের দেশে তো টেফলন দিব্যি চলছে।

প্রায় মাসখানেক হলো ফোন ছেড়ে দিয়েছি। ছেড়ে দিয়েছি মানে, ড্রয়ারে রেখে দিই। সকালে, রাতে একবার করে ব্যবহার করি। বাসে যখন যাতায়াত করি, দেখি প্রায় সকলেই চোখে, কানে ফোন গুঁজে বসে আছে। কেউ বা ফোনের স্ক্রিনে অনবরত টোকা মেরে যাচ্ছে। স্ক্রিনে কি এলো হয়ত দেখছেও না। এই কি ব্যাধি? মহামারীর আকার নিয়েছে? মোবাইল ছেড়ে অবধি, আমার মানসিক শক্তি অনেকখানি ফিরে এসেছে। কাজও ভালো হচ্ছে।

ফেরার সময় দেখলাম তুষারপাত শুরু হয়ে গেছে। রাস্তা, বাড়ি সব বরফে ছেয়ে যাচ্ছে। ব্যাগ থেকে রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘তিব্বতে সোয়া বছর’ বার করলাম। চলাফেরার ফাঁকে এই আমার সঙ্গী। রাহুল লাসায় পৌঁছেছেন। সেখানেও বরফ পড়তে শুরু করেছে। ১৯২৯ সাল। হিটিং এর বালাই নেই। কি করবেন রাহুল? তুষারমৌলি হিমালয়ের সেই দেশ থেকে সহস্র যোজন, কয়েক দশক তফাতে দাঁড়িয়ে আমি অধীর আগ্রহে বইএর পাতায় ডুব দিলাম।

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: