রবি ঠাকুর বললেন, ‘পয়সা নেই তো কি? আমি ২০০টাকা মাসোহারা পুঁজি করে বোলপুরে আশ্রম ফেঁদেছিলাম।’

‘তারপর?’

‘তারপর আর কি। ছড়িয়ে লাট। মাস্টারদের মাইনে থেকে ছাত্রদের ঘরের ছাদ। টাকার টানাটানিতে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। শেষে সাউথ থেকে পয়সা পেলাম। আমেরিকার ডোনেশন এল। তবে না টিঁকল।’

রবি ঠাকুর এমনি চাপলেস মানুষ। এই টাকার টানাটানির মধ্যেই মিটিং মিছিল করছেন। কার্জন সায়েবের বাংলা ভাঙার ছক বানচাল করার জন্যে গান বাঁধছেন, পদ্য লিখছেন।

আমি বল্লাম ‘এত চাপ না নিয়ে গ্রীন কার্ডের জন্যে দরখাস্ত করে দাও।’

রবি বললে, ‘না ভাই। বরং খোকাকে শিখতে পাঠাই। দেশে ফিরে কৃষি কাজ করবে।’

কি যন্তর রে বাপ! কবীরের গান ছিল, ‘জানি না সুমন তুমি কৃষিকাজ কেন যে জানোনা।’

সন্দেহ হল রবি আমাদের সুমন শুনে বেড়াচ্ছে নাকি!

‘সবই তো বুঝলাম। তোমার আর কি। নোবেল পেয়েছ। এখন তো এখানেই খাতির বেশি।’

রবি চায়ের ভাঁড়টায় শেষ চুমুক দিয়ে হো হো করে হেসে উঠল,

‘নোবেল! সে তোর ঠাকুদ্দা যদি সায়েবদের পেয়ারের হত, প্রিন্স হত, তবে তোরও পাঁচটা কনট্যাক্ট হত। নোবেল হত। সবই নেটওয়ার্ক গুরু। এ জন্যই প্রথম ভাগে লিখেছিলুম বেশি ফেসবুক না করে লিঙ্কডইনটায় মন দে।’

তাইলে সবটাই ছক নাকি? মনটা ছকু ছকু করতে লাগল।

বাইরে হঠাৎ তুষারপাত শুরু হয়েছে। বয়স্ক এক দশাসই আফ্রিকান আমেরিকান ভদ্রলোক সামনের টেবিলে বসে। কফির কাপ আঁকড়ে ধরে সে জিরিয়ে নিচ্ছে যেন।

রবি আলতো করে বললে, ‘প্রাইজের কথা বলতে পারবনা ভাই। তবে আলসেমি করিনি কখনো। দু:খবিলাস করিনি কখনো। এটুকু বলতেই পারি।’

আমি এসব শুনছি না। বয়স্ক ভদ্রলোক অন্যমনে বসে। বাইরে নীলাভ সন্ধ্যা বন্দী হয়েছে মুঠো মুঠো বরফের কুঁচিতে।

রবি আমাদের শুধু কাব্য করেনি। সাঁইত্রিশ দেশে চরকি পাক খেয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়, ইসকুল ফেঁদেছে, নয়া শিক্ষাচিন্তার বাস্তবিক এক্সপেরিমেন্ট করেছে, বাংলা পরিভাষার কাঠামো বানিয়েছে, ইংরাজের বিরুদ্ধে মিছিলে হেঁটেছে। এ সমস্ত করে আড়াই হাজার গান লিখেছে, ডজন ডজন নাটক নভেল লিখেছে, কৃষি ব্যবস্থা, সামাজিক পুনর্গঠনের মডেল বানিয়েছে!

‘রবি তোমার নোবেল ছকবাজিটা মাফ হল। আলসেমি করোনি কখনো। সে সত্যি। আর দুখু দুখু ন্যাকামি তো নয়ই।’

বাইরে ততক্ষণে ফুটপাতে বরফের স্তুপ জমে উঠেছে। ভদ্রলোক কফি শেষ করে উঠে পড়লেন। হাতে তার ক্রাচ। মেরুদণ্ড ঋজু। নীলাভ রোদ্দুর মাখা তুষারাবৃত শূন্য পথে তিনি নামলেন একাকী। আমি রবির দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেলাম।

রবির চোখে তখন ইমনকল্যাণ। রবির ওষ্ঠে তখন যক্ষসম্ভব।

পরদেশি এই বিজন নগরে তখন ‘তিমির কাঁপিবে গভীর আলোর রবে।’

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: