আমার ঘরের সামনে একটা পিচ ফলের গাছ আছে। সন্ধ্যে হলে, মাঝে মাঝে, সেখানে একটা খরগোশ আসে। জানলা গুলো বেশ বড়। আমি খুলে দিই। খরগোশটা পিচ ফল খায়। দেখি।

এখানে এখন পাতা ঝরার দিন। ওদিকে দেশে নাকি জীবনের স্রোত বইছে। খবর পাই। টের পাই। কত দুঃখ, কত মান অভিমান, কত নিবিড় রাতের একলা অভিযান। দমকা হাওয়ার মত, খবর গুলো আমার ঘরে আসে।

দিন ছোট হয়ে আসছে। বাতাসে শিরশিরানি ভাব। ছেলেটি পাশের টেবিলে বসে ছিল। এগিয়ে এলো কথা বলতে। ‘ব্যাগটার দাম কত?’ ‘ইলেক্ট্রিকাল পড়তাম শিকাগোতে। ভালো লাগেনি। ইঞ্জিনীয়ার হওয়া আমার কম্মো নয়।’ এই সব কথা। কতই বা বয়েস হবে। বছর বাইশ। এমন আড্ডা আমার প্রায়ই জমে যায়। কফিশপে, লেকের ধারে, বাসের মধ্যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আমি জানলা গুলো খুলে দিই। পিচ ফলের গাছ। তার আসে পাশে, ঘাসে ছাওয়া অঞ্চল। কাঠের বেড়া দিয়ে ঘেরা। এক কোণ ঘেঁষে টালি বাঁধানো পথ গিয়েছে। আমার হঠাৎ দেউলটির কথা মনে পড়ে।

শরৎচন্দ্র ঘর বেঁধেছিলেন রুপনারায়ণের তীরে। ‘বর্ষাকালে, জল ছাপিয়ে ঘরে আসে।’ ঘরটা দেখতে প্রকাণ্ড প্যাগোডার মত। শরৎবাবু বার্মাতে ছিলেন বহুকাল। হয়ত হৃদয়ে তার প্রবাস বাসা বেঁধেছিল। বাংলায়, তাই তিনি একটুকরো ভিনদেশের চারা পুঁতেছিলেন।

‘যীশু দাঁড়িয়ে আছেন কিনারায়। হঠাৎ তিনি হাঁটতে শুরু করলেন জলের ওপর দিয়ে। ম্যাথু টুয়েন্টি ট্যু।’ মাঝ বয়েসী ককেশিয় যুবক আমায় ডেকেছিল। বাইবেল পড়া হবে। ধর্ম নিয়ে আমার আগ্রহ অনেক কালের। ‘নিশ্চয় যাবো’। পাশের টেবিলে বসেছে কজন। সেই যেন নিশ্চিন্দিপুরের হরিহর। সেই যেন পিদিম জ্বলছে, সন্ধ্যে হয়েছে, অপু বসেছে পাঁচালি শুনতে। আমাকে যে ডেকেছিল, সে নাকি পুয়ের্তো রিকোর বাসিন্দা।

‘তবে আমি চার বছর বয়েস থেকেই এখানে।’ ছেলেটি এখন একুশে পা দিয়েছে। ‘তোমার কত বয়েস।’

আমি হেসে বললাম ‘ত্রিশ।’

‘তাতে কি হয়েছে।’ সে আমায় খানিক সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করলে। হয়ত সে ভাবে ত্রিশ বছর মানে যৌবন শেষ। আমি মনে মনে হেসে ফেললাম। বুদ্ধদেব বসুর ‘উত্তর তিরিশ’টা ছোকরাকে গছাতে হচ্ছে।

‘না না। ত্রিশ তো খুব চমৎকার বয়েস। আমার তো খুব ভালো লাগে।’

ছেলেটি দৃশ্যতই অপ্রস্তুত। বললে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। আমারও ইচ্ছা করে ত্রিশে চলে যেতে সটান। মনে হয় ততদিনে জীবনটা একটা শান্ত জায়গায় চলে আসবে। অনেকটা গুছিয়ে উঠবে।’

এবার আমি হেসে ফেল্লাম। ‘না হে বন্ধু সে সব হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে সে বয়েসেরও একরকম মজা থাকবে, তা বলতে পারি।’

আমার ঘরে তিনটে আলো আছে। আজ সন্ধ্যে হতেই আলো গুলো নিবিয়ে দিয়েছি। এত কোলাহল ভালো লাগে না। বাইরে কনকনে একটা হাওয়া দিচ্ছে। তবু জানলা খুলে রেখেছি। আচ্ছা আকাশের রঙটা এমন কেন? কেমন নীলে, লালে, মিশে মিশে আছে!

আমি থুতনি জানলার গায়ে ঠেকিয়ে বসলাম।

খরগোশটা হয়ত আসবে। একটু পরেই।

Join the Conversation

2 Comments

    1. অজান্তেই একটা বিষন্নতা জড়িয়ে যায় লেখায়। পড়লেন জেনে আনন্দ হল খুব। আমি তো প্রবাসে প্রায় দৈবের বশে। মন দেশে পড়ে থাকে।

      Like

Leave a comment

Leave a Reply to Debarati datta Gupta Cancel reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: