১। একটি খুনের ঘটনা


সুমন্ত্র আমায় রাত দুটোয় মেসেজ করল, ‘চলে আয় বাগবাজারে। ভোর দেখতে ইচ্ছে করছে।’

ভোর মানে কাক ডাকা ভোর। আমি ট্রামে উঠে পড়লাম ৪টে ৪০শে। ভোরবেলা ট্রামে চড়ার মজাই আলাদা। রাস্তায় জ্যাম নেই। লোক জন অল্প। কলকাতা যে একসময় কত সুন্দর ছিল, তা ভোরের ট্রামে চাপলে টের পাওয়া যায়। বিশেষ করে চিৎপুরের পুরোনো বাজার, চৌক, প্রাসাদের মাঝখান দিয়ে যখন ঠুন ঠুন করে গাড়ি ছোটে, তখন মনে হয় বুঝি প্রাচীন কোনো মায়া নগরে চলে এসেছি।

ও বাগবাজারের সারদা ঘাটেই যাবে। জানি ওটাই ওর প্রিয়। ফোন তো নিশ্চয় বাড়িতে রেখে এসেছে।

তড়াক করে নেমে পড়লাম ট্রাম থেকে। এ দিকটা আরো নির্জন। রাস্তাটা সোজা গ্যালিফ স্ট্রিটের দিকে চলে গেছে। ট্রেন লাইন টপকে গঙ্গার ঘাটে পৌঁছে দেখি সুমন্ত্র কালী মন্দিরের পাশে বসে আছে।

আমাকে দেখতে পেয়ে ও হাতছানি দিয়ে ডাকল।

একজন চা-ওয়ালা এই সাত সকালেই জীবিকার খোঁজে নেমে পড়েছে।

‘কত করে?’ ‘পাঁচ’।

ঘাট এমনি ফাঁকা। খানিক দূরে এক মারোয়ারি ভদ্রলোক বসে আছেন। বয়স্ক সৌম্য দর্শন মানুষ। হাতে একটা রেডিও। সম্ভবত অল ইন্ডিয়া রেডিও-র কোনো চ্যানেল বাজাচ্ছেন। পর পর মুকেশের গান চলছে।

এমনিতে হয়ত সকালের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করার জন্য একটু বিরক্তই হতাম। কিন্তু মুকেশের কণ্ঠ যেন ভোরের সৌন্দর্য্য আরো বাড়িয়ে দিচ্ছিল।

ঘাটের ধারে ল্যাম্পপোস্ট গুলোতে আলো জ্বলছে। আমি গান শুনতে শুনতে চা-এ চুমুক দিলাম।

পরবর্তী তিন মিনিটে যে ঘটনাগুলো ঘটল, তা বর্ণনা করা হয়ত তৎক্ষণাৎ দুঃসাধ্য হত। বহুবার সুমন্ত্র-র সাথে আলোচনা করতে করতে ঘটনা পরম্পরা আমার কাছে খানিকটা পরিষ্কার হয়েছে।

সুমন্ত্র বলেছিল, ‘লিখছিস যখন, তখন এ জায়গাটা পয়েন্ট করে লিখবি। পাঠকের সুবিধা হবে।’ তাই হোক তবে।

১। দূর থেকে ট্রেনের শব্দ শুনে আমরা ওদিকে তাকালাম

২। ট্রেন লাইন টপকে প্রায় তিনজন মানুষ এগিয়ে আসছেন। তাদের চেহারা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু তাদের হাতের আগ্নেয়াস্ত্র গুলো ঠিকই বোঝা যাচ্ছে।

৩। মারোয়ারি ভদ্রলোক উঠে পড়লেন। ভয়ে ওনার মুখ সাদা হয়ে গেছে। একবার আমাদের দিকে তাকিয়ে উনি গঙ্গার দিকে অজান্তেই পিছিয়ে গেলেন।

৪। তিন জন ওনাকে ঘিরে ধরল।

৫। ততক্ষণে ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে।

৬। ভদ্রলোক ঘাটের একদম কানায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছ’ছবার ফায়ার হল। তিন দিক থেকে। ওনার দেহটা আমাদের চোখের সামনে ধুপ করে জলে পড়ে গেল।

৫। ট্রেন ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে। তিন জন ঘাতক লাইন ক্রস করে ভোরের কলকাতায় মিলিয়ে গেল।

পাশেই চা’ওয়ালার গলার আওয়াজে আমার সম্বিত ফিরেছিল। ‘বাবু! খুন!।’

সুমন্ত্র ছুটে গেল ঘাটের দিকে। নাহ! ভরা কোটালের গঙ্গা। লাশ কোথায় ভেসে গেছে কে জানে।

রেডিওটা তখনো বেজে চলেছে। তার পাশে ভদ্রলোকের ঝোলা ব্যাগটা পড়ে।

‘ধরিস না কিছু। আগে চল থানায়।’ সুমন্ত্রের চোখে আতঙ্ক নেই। কপালে চিন্তার ভাঁজ। আমরা চাওয়ালাকে অছি করে বাগবাজার থানার দিকে হাঁটা দিলাম।

(চলবে) 

 

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: