খড়কুটোর ওড়না

পাকিস্তানি তরুণীর মাথায় কালো টুপি, পরণে লাল কোট। আর পাঁচটা দিনের মতই সে কিঞ্চিৎ ‘নাচিতে নাচিতে’ আসছিল আমাদের ফ্ল্যাটবাড়িতে।

বিকেল পাঁচটার মেঘলা আকাশ। বর্ষণবিদীর্ণ হৃদয় নিয়ে আমারাই বরং কাঁচে মোড়া ঘরে বসেছিলাম। সে চলেছিল নিশ্চিন্ত রেডরাইডিং হুডের মত।

আর হবে নাই বা কেন? সদ্য সে প্রণয়ভাষ পেয়েছে সুদূর আফ্রিকাদেশের যুবকের থেকে। সে প্রেম টিঁকুক বা উচ্ছন্নে যাক। অন্তর্দেশে আলপনা আঁকতে তো বাধা নেই।

আমি নিতান্ত পিঠের ব্যাথায় কাত হয়ে পড়েছিলাম। একে একুশে ফেব্রুয়ারির ভোর (কলকাতায়)। তারওপর বঙ্গসন্তানের পিঠে ব্যাথা। পাকিস্তানি বন্ধুর শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া গতিই বা কি!

খাবারদাবার আর ব্যাথার মলম নিয়ে এল বন্ধু। খানিক হাউ হাউ করে আড্ডা হল। এদিকে আমি হাসতে পারছি না মোটে। পিঠে লাগছে যে! দাঁতেও। কি যে হয়েছে কদিন। নিতান্ত ফিট থাকি সংবৎসর। এইবারে একদম কাত হয়ে পড়েছি। তাও আবার বিচিত্র ব্যাথা বেদনায়। সে যা হোক। আড্ডা হল কিছুক্ষণ। সে নানান অঙ্গভঙ্গী করে প্রণয় নিবেদনের কাহিনী বললে। এই প্রবাসে মানুষের আর পাঁচটা বিনোদন ফিকে হয়ে আসে। আড্ডা টুকুই বেঁচে থাকে।

পাকিস্থানি বন্ধু চলে যাওয়ার পর আমি শুয়ে পড়লাম চুপচাপ। ঘরটা অন্ধকার। এখানে অপুর নিশ্চিন্দিপুরের মত জানলা নেই মোটে। একফালি গর্ত আছে। কিন্তু আকাশ দেখা যায় না। অথচ হৃদয়ে একুশের চোখের জল টুপটুপিয়ে জমে। সেই আকাশের অহমিকা। সেই অসম্ভবের স্বাধীন উচ্চারণ। বলেই দেখি না নিজের ভাষায় কথা। গেয়েই দেখি না গান। ‘হোক বেসুরো পর্দা বদল’।

সেই কলকাতায় বেঁচে থাকা দম্পতির মত আমিও আজ পাখি হতে চাই। ঘরের আঁধার পেরিয়ে সমুদ্দুর উজিয়ে নিজের মেয়ের কাছে বসতে চাই দু দণ্ড। কেমন আছিস মেয়ে? গোড়ালির কাছের ব্যাথাটা আর ব্যাথা দিচ্ছে না তো? সক্কালবেলা আদুরে গলায় বলতি, ‘আর একটু শুই মা’। চা নিয়ে আসতাম বালিশ পেরিয়ে। কেমন আছিস মেয়ে? কতদিন দেখিনা তোকে। আজ এই ডানা পেলাম তাই না দেখা হল।

তারপর সে পাখির ডানায় আমি উড়েছি আরো সমুদ্দুর পার। পাহাড় নয়, অন্ধকূপে ঠোঁটে নিয়ে গেছি একুশের খড়কুটো। সেখানে লুটিয়ে আছে আদিবাসী কন্যার দেহ। ছিটিয়ে আছে রক্তস্নাত বন্দর। আমাদের এই সভ্যতা। এই শহর। ঢেকে দিয়েছি একটু একটু করে। শরীর নয়। মানিনীর ক্ষত। ডাইনি বলে দুমরিয়েছে তার ওড়ার ডানা দুটো।

এই তো আমার উড়ান। অন্ধকার পেরিয়ে আলোয় যাওয়ায় আজান।

পিঠের ব্যাথাটা একটু কোমল হলে এসেছে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল ছিল না।

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: