বসন্ত

আমাদের খেঁদি তোমাদের পটলকে কলেজস্কোয়ারের মোড়ে ধরিয়া ফেলিল। ‘তবে রে মর্কট। পালাচ্ছিলি যে বড়!’


পটলকুমার দেখিল বিপদ বড় কম নহে। প্রথমত তাহার কসুরটা কি তাহা বোঝা যাইতেছে না। মেডিক্যালের সামনে সে আজ অন্তত যথা সময়েই পৌঁছাইয়া ছিল। নিত্য দিন সে বিলম্বে আসে। আজ তাহা ঘটে নাই।
দ্বিতীয়ত আজ তাহার পকেটে কিঞ্চিৎ অর্থসমাগম ঘটায় সে বসুশ্রীর পিছনের সারীর দুখানা টিকিট পর্য্যন্ত ক্রয় করিয়াছে। তাও আবার খেঁদির পছন্দের চলচ্চিত্র। 
তথাপি সে যখন আলুকাবলি খাইতে খাইতে দেখিল যে খেঁদি দুর হইতে দাঁত কিড়মিড় করিতে করিতে আসিতেছে, তাহার রিফ্লেক্স বলিল, বাছা পটল, আজ আকাশের অবস্থা সুবিধার নহে। চম্পট দাও।
এই লুকাচুরি খেলা আজ তিন বৎসর হইল চলিতেছে। খেঁদি প্রথম প্রথমে পারিত না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সে শিখিয়াছে উত্তর কলিকাতার অলিগলি। আজ সে পটলকে ধরিয়া ফেলিল।
‘পালালি কেন মর্কট?’
‘মানে তুই এমন কিড়মিড় করে আসছিলি… ‘
‘ন্যাকা! তোর পেটে পেটে এত শয়তানি তো জানতাম না।’
পটল ধরা পড়িয়া কিঞ্চিৎ ভ্যাবলাইয়া গেছিল। খানিক কিন্তু কিন্তু করিয়া প্রশ্নটা করিয়াই ফেলিল, ‘কি হয়েছে খেঁদি?’
‘কি হয়েছে! তোর এই পুরুষতান্ত্রিক অত্যাচার সহ্য করার আগে আমি সব জ্বালিয়ে দিতে পারি তা জানিস?’
পটল যারপরনাই ভাবিত হইল। নিজের এ হেন অত্যাচারের কাহিনী শুনিয়া তাহার রক্তও কিঞ্চিৎ উষ্ণ হইয়া উঠিল। ছেলেবেলায় তাহারও বিপ্লবের শখ ছিল। নারীমুক্তি, শোষণমুক্তির পোস্টার সেও কলেজস্ট্রিট হইতে কলেজস্ট্রিট পর্য্যন্ত সাঁটাইয়াছিল।
‘তাই তো খেঁদি। এই অত্যাচার তো অসহ্য।’
‘অসহ্য! এই অত্যাচারের বিরুদ্ধেই না এত বড় বড় কথা বলতি? আর এখন তুইই? ছিঃ। বিয়ে মানে কি দাসীবৃত্তি? প্রেম করার সময় যত ভালোভালো কথা। আর বিয়ে হলেই চাকরি ছাড়ো, বাকরি ছাড়ো, নাচ ছাড়ো, রাজনীতি ছাড়ো?! ‘
খেঁদির কথা শুনিয়া ততক্ষণে পথপার্শ্বে কিঞ্চিৎ জনসমাগম হইয়াছে। একজন অল্পবয়সী ছোঁড়া ফুট কাটিল, ‘দিদি যত দিন বিপ্লব না হচ্ছে তদ্দিন কিস্যু হওয়ার নয়।’
জনৈক বয়স্থ্য ব্যক্তি রোষকষায়িত নেত্রে পটলকে ভস্ম করিবার চেষ্টা পাইলেন, ‘এই সব হিপোক্রিটদের জেলে দেওয়া উচিৎ। ছোকড়া, নারী জাতি হল মাতৃসমা। দুর্গা বলে যাকে পূজা করো তাকেই ঘরের মধ্যে অত্যাচার করো? ধিক!’
আমাদের পটল মনে প্রাণে কমিউনিস্ট। তাহার কর্ণে এহেন রিগ্রেসিভ লজিক বেতালা শোনাবে তাহাতে আশ্চর্য্য কি। সে একখানা যুৎসই উত্তরও খুঁজিতে যাইতেছিল। কিন্তু তাহার পূর্বেই অন্য একটি খটকা তাহাকে পাড়িয়া ফেলিল, ‘এই বিয়ের ব্যাপারটা কি দাদা? কার বিয়ে?’
‘সে কি হে ছোকড়া। সামান্য ঝগড়ার জন্যে বিয়েকেই অস্বীকার করতে চাও। নাঃ তোমাকে তো শিক্ষা দিতে হচ্ছে। চল মেয়ে আমরা থানায় যাই।’
খেঁদি দেখিল তাহার ঝগড়ায় বিলক্ষণ বাধা পড়িতেছে। সে ক্রুদ্ধ হইয়া বলিল, ‘কে বলেছে যে বিয়ে হয়েছে?’
‘সেকি মা! এই যে তুমি অত্যাচারের কথা বলছিলে।’
‘সে বিয়ে হলে করবে, সে কথা বলছিলাম।’
জনতার ক্রোধ দিশাহারা হইয়া গেল। ফিউচার টেন্সে কলহ হইতেছে ইহা তাহারা বোঝেন নাই। অগত্যা ভীড় পাতলা হইয়া গেল।
পটল এক গাল হাসিয়া বলিল, ‘বসুশ্রীর দুটো টিকিট আছে। যাবি নাকি?’
খেঁদি কাঁদোকাঁদো হইয়া কহিল, ‘তবে যে শুভার বর তাকে এমন পেটালো? চৈতীর শাশুড়ি যে তাকে চাকরি করতে দেয় না? মণিকে যে মাস্টার্স পাশ করে দুবেলা দশজনের খাবার রাঁধতে হচ্ছে? জানিস ওর হাতে অবধি কড়া পড়ে গেছে!’
পটল বলিল, ‘দেখ খেঁদি। হতে পারে এমনি অত্যাচার আমিও করব। হতে পারে করব না। হতে পারে তুইই আমায় পেটালি দিবারাত্র। কিন্তু চান্স যদি নিতে হয়, তবে তোরই সাথে, তাই না? আচ্ছা শোন। চুরমুর খাবি?’
হেমন্তের বৈকালে, শহর কলিকাতায়, অকস্মাত বসন্ত আসিয়া পড়িল।

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: