পরাজয়

সুধা বলিল, হ্যাঁ গা, তোমার দৃষ্টি অমন কেন? যেন দানোয় পেয়েছে?

সদানন্দ ফিরিয়া আসিয়াছে। বিশ্ব সংসার ভ্রমণ করিয়া, বিস্তর ধনরাশি, বিদ্যারাশি অর্জন করিয়া, তাহার ময়ুরপঙ্খী আজিকে প্রত্যুষে ময়নামতী গ্রামের বুড়োশিব ঘাটে নোঙ্গর ফেলিয়াছে।

সদানন্দের গৃহে আজ বড় উৎসব। পুত্রের প্রত্যাবর্তনে, মাতাঠাকুরাণি আনন্দ ধরিয়া রাখিতে পারিতেছেন না। গ্রামবাসীরা সকাল হইতে অনবরত আসিতেছে। কাহারো চক্ষে স্নেহ, কাহারো কণ্ঠে ঈর্ষা, কেহ বা পুরাতন সখ্যের দোহাই পারিয়া উপহার ভিক্ষা লইতে আসিয়াছে। সদানন্দ সুভদ্র মার্জিত যুবক। সে সকলের সাথে ধীরে ধীরে কথা কহিতেছে। ‘শ্যামদেশের লোকেরা শুনিয়াছি আঠারো হাত লম্বা। সত্যি নাকি বাছা?’ ‘কর্ণাটের পথে ঘাটে নাকি মণি রত্ন ছড়ানো! কিন্তু তুলিবার যো নাই?’ এমনি নানা প্রশ্নের উত্তর, সদানন্দ শান্ত ভাবে দিতেছে। মধ্যে মধ্যে মাতাঠাকুরাণি আসিয়া অতিথিদের মৃদু শাসন করিতেছেন, ‘বাছা আমার সবে গৃহে ফিরিয়াছে। তোমরা যেন বেশি বিরক্ত করিও না।’

দেখিতে দেখিতে বেলা বহিয়া গেল। সূর্য্যদেব দিকচক্রবালে ঢলিয়া পড়িলেন। হেমন্তের গোধূলিতে ধীরে ধীরে সকলে আপন গৃহে ফিরিতে লাগিল। ময়নামতী ক্ষুদ্র গ্রাম। তাহার উত্তেজনা ক্ষুদ্র। আশা, দুঃখ সকলই ক্ষুদ্র। চন্দ্রাচ্ছন্ন প্রদোষকালে সদানন্দের বৃহৎ ময়ুরপঙ্খী বুড়োশিবের ঘাটে একাকী থমকাইয়া রহিল।

যাহার জন্য সদানন্দ এই বৃহৎ আয়োজন করিয়াছিল, এক্ষণে সেই সুধার খোঁজ লওয়া আবশ্যক। পাঠকের অনুমান সঠিক। এই বৃহৎ দেশান্তর, ধন এবং বিদ্যার্জনের মূলে এক শীর্ণা কিশোরীর কোনো এক বিস্মৃতপ্রায় অপরাহ্নের মৃদু দৃষ্টিপাতই দায়ী।

যৌবনকালে যে সকল অসম্ভব ঘটনা ঘটিয়া থাকে, তাহার প্রতি বয়স্থ গম্ভীর ব্যাক্তিরা আস্থা রাখিতে না পারেন, কিন্তু বিশ্বাস অবশ্য করিবেন। বিশ্বাস না হইলে আপন যৌবনের বৃত্তান্ত স্মরণ করুন। অষ্টাদশবর্ষের আপাত অনাবশ্যক সেই সকল তীব্র অভিমানের, অভিযানের বৃত্তান্ত স্মরণ করুন। বিশ্বাস আপনি ফিরিয়া আসিবে।

ময়নামতীর বেত্রকুঞ্জে, কোনো এক শরৎএর অপরাহ্নে, যে প্রণয়ের সূত্রপাত হইয়াছিল, তাহারই রাক্ষসে ভর করিয়া আমাদের সদানন্দ এই ভুবনবিদারি কাণ্ড ফাঁদিয়াছে। তাহার সকল অভিযানের কেন্দ্রে কেমন করিয়া সুধার নবদুর্বাদলশ্যাম ক্ষুদ্র মুখখানি ভাসিয়া উঠিত, ইহা যে প্রণয় না করিয়াছে তাহাকে বুঝানো অসম্ভব। আজি বহু বৎসর পার করিয়া, মহাসমারোহে সে গৃহে ফিরিয়া আসিয়াছে। তাহার মস্তক ধনে, মানে, বিদ্যায় গগন স্পর্শ করিতেছে। এই বিজয়যাত্রা সমারোহে সুধা কই?

আমাদিগের কাহিনী এইখানেই থামিতে পারিত। সদানন্দ দুঃখ চাপিয়া শয়ন করিত, গ্রামবাসী দুগ্ধফেননিভ তন্ডুল খাইয়া ঘুমাইয়া পড়িত, আর আমাদিগের পাঠও সমাপ্ত হইত। কিন্তু সুধা আসিয়া সকল গোলমাল করিয়া দিল।

রাiত্র প্রথম প্রহরে সুধা আসিয়াছিল। ক্ষুদ্র ময়নামতী গ্রামের ক্ষুদ্র দেহী কন্যা। সদানন্দের পালঙ্কে কিয়ৎকাল নিশ্চুপ হইয়া বসিয়াছিল। তারপর সমস্ত উৎসব বিদীর্ণ করিয়া বলিয়াছিল, “হ্যাঁ গা, তোমার দৃষ্টি অমন কেন? যেন দানোয় পেয়েছে?”

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: