(Ei-Samay, 13th November, 2016. By Partha Acharya)

শৃঙ্গ বিজয় অনেকেই করেছেন , করবেন — তা সত্যি সত্যিই শৃঙ্গ বিজয় কিনা সে নিয়েও তর্ক-বিতর্ক চলবে৷ কিন্ত্ত শৃঙ্গ বিজয় করে তাকে শিল্পপীঠ করে তোলা ? এমনটা শুনেছেন ক’জন ?ছোটো টিলা পাহাড় , তাকে ঘিরে রাখা শাল , শিশু , মহুয়া , পলাশের জঙ্গল৷ একই সঙ্গে সেই জঙ্গলে পাওয়া যাবে দরিদ্র শিশুর মতো (যে শিশুদের ছবি নিজেদের প্রচার পুস্তিকা কিংবা উপস্থাপন ব্যবহার করে বাহবা কুড়ায় পৃথিবীখ্যাত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি ) শীর্ণ এক নদীকে৷ রাসপূর্ণিমার কুয়াশার চাদর মুড়ে রেখেছে গোটা পাহাড় , জঙ্গলকে৷ কোনও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন নেই৷ পুরুলিয়ার খড়িদুয়ারার কুমারীগ্রামের টিলা পাহাড়ের তিন শৃঙ্গকে ঘিরে সৃজন ভূমি৷ প্রথাগত মঞ্চ নেই, উত্সবের আড়ম্বর নেই৷ অথচ তিন দিনের সৃজন উত্সবে মেলা জমান অগণিত মানুষ৷ এই শৃঙ্গ বিজয় যে সকলের৷ তাই নেই কোনও স্বেচ্ছাসেবক , নেই কোনও নেতা , মন্ত্রীর উপস্থিতি৷ নেই কোনও বিশৃঙ্খলা কিংবা হাঙ্গামাও৷ রাসপূর্ণিমায় এ দেশের প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রগুলি আচমকাই বেজে ওঠে একসঙ্গে৷ যেন দেশজ কনসার্ট! কুমারী গ্রামের সৃজনভূমির তিন শৃঙ্গ মেতে ওঠে জয়ের আনন্দে৷ সৃজন উত্সব৷ গত ২২ বছর ধরে এ ভাবেই চলে আসছে বাংলার ভারত মেলা৷

রাজস্থানের কালবেলিয়া , অসমের বিহু , মিজোরামের বাম্বু ড্যান্স , সিকিমের লোকনৃত্য , পুরুলিয়ার ছৌ, টুসুর পাশাপাশি ওপার বাংলার লোকগান৷ শিল্পের মেশামেশিতে জীবনের হূত্স্পন্দন৷ সময়টা ১৯৯৫ সাল৷ পুরুলিয়ার এক দল তরুণ ঠিক করলেন দেশজ সংস্কৃতির প্রচার , প্রসার , উন্নয়নে একট মেলা আয়োজন করবেন৷ কবি নির্মল হালদার , সাহিত্যিক সৈকত রক্ষিত , পরিমল দে, দূর্বা মুখোপাধ্যায় , অনন্ত লাল মাহাতো , গৌতম দত্ত , মৃত্যুঞ্জয় মর্দন্যারা দিনরাত সাইকেল নিয়ে চষে বেড়াচ্ছেন পুরুলিয়ার জঙ্গল , পাহাড় , ডুংরি৷ টিলা , জঙ্গল , নদীতে ঘেরা খড়িদুয়ারার সৃজনভূমি পছন্দ করেন তাঁরা৷ ঠিক করা হয় কোনও মানুষের নামে মঞ্চ নয় , তিন টিলা পাহাড়কে কিষ্কিন্ধ্যা শিল্পপীঠ , মহেন্দ্র শিল্পপীঠ , চিত্রকূট শিল্পপীঠ নামে চিহ্নিত করা হয়৷ প্রথম কয়েক বছর মেলা শুরু হত কোজাগরী পূর্ণিমায় , দু’দিনের জন্য৷ টিলাকে স্বাভাবিক রেখে মেলার মঞ্চ সাজানো হয়৷ তবে প্রথম বছরের উত্সব মাটি হয়ে যায় ঝড় , বৃষ্টিতে৷ পাহাড়কে সাজাতে নিয়ে আসা হয়েছিল কয়েক হাজার লণ্ঠন৷ সেগুলিও নষ্ট হয়৷ তবে আশপাশের গ্রামের মানুষের ঢল দেখে ওঁরা বুঝতে পারেন , এই সেই মহাশিলাপীঠ , যার খোঁজে ‘সত্তরের যীশু ’ নামে একটি পত্রিকা শুরু করেছিল ওঁরা৷ জীবন ও শিল্পের চমত্কার মিশেল আর কোথায় পাওয়া যাবে ? প্রথম বছর থেকেই ঠিক করা হয়েছিল মেলার প্রচারে কোনও পোস্টার বা দেওয়াল লিখন নয় , দেওয়া হবে না কোনও বিজ্ঞাপন৷ তবে প্রচারে ব্যবহার করা হবে কয়েক হাজার লিফলেট৷ সঙ্গে থাকবে মানুষের মিছিল৷ ঘুরে ঘুরে চলবে প্রচার৷ সমস্যা হয় এখানেই৷ সৃজন উত্সবের এমন জনপ্রিয়তা দেখে টনক নড়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের৷ সহজে মেলার উদ্যোক্তা হিসাবে ভিড়বার অধিকার তাঁদের আছে ভেবে যে সব নেতারা গিয়েছিলেন , তাঁদের ভুল ভাঙে৷ আসে নানা রকম হুমকি , এমনকী প্রাণে মেরে ফেলবারও৷ তবে এই সব থ্রেট হার মানে সৃজন উত্সবের জনপ্রিয়তায়৷ আদিবাসী অধ্যুষিত পুরুলিয়ায় আদিবাসী শিল্পীদেরই পারফরম্যান্সের পর খাবার দেওয়া হত না৷ আদিবাসীরা নাকি অনেকটা খান , তাই টাকা ধরে দিয়ে দায় সারা হত৷ সৃজন উত্সবে এই রেওয়াজ ভাঙা হয়৷ সৃজন ভূমিতে তৈরি করা হয় অস্থায়ী আখড়া৷ যেখানে খড়ের বিছানায় বিশ্রাম নিতে পারবেন সকলেই৷ দু’বেলা খাবার ব্যবস্থা করা হয় শিল্পী , অতিথি , গ্রামের মানুষের জন্য৷ ডাল , ভাত , লাউ চিংড়ি , মুরগির মাংস , চাটনি — কয়েক হাজার মানুষকে পাত পেড়ে খাওয়ানো চলে দু’বেলাই৷ এর জন্য সারা বছর নিজেরা টাকা জমান , চাঁদা তোলেন উদ্যোক্তারা৷ এখানে স্টল দিতে আসা গরিব আদিবাসী দোকানদারদের কাছে কোনও ভাড়া নেওয়ার চল নেই৷ টাকা নেওয়া হয় শুধু সরকারি স্টল কিংবা বহুজাতিক কোনও সংস্থা স্টল দিলে৷ প্রত্যেক লোকশিল্পীকে সাম্মানিক দেওয়া হয় নিয়ম করে৷ খরচের এই বিশাল দায়ভার বহন করতে গোটা বছর এ দুয়ার সে দুয়ারে ঘুরে যান সৈকত রক্ষিত ও তাঁর বন্ধুরা৷ কেউ আশ্বাস দেন , কেউ আবার সাহায্যও করেন৷ দেখতে দেখতে বাইশ বছর৷

srijan2

শঙ্খ ঘোষ জনগণের এমন মেলায় অভিভূত হয়ে বলেছিলেন , এক দিন কেঁদুলি মেলার চেহারা নেবে সৃজন উত্সব৷ এমন মেলার টানে কবিতা পড়তে ছুটে গিয়েছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়৷ গিয়েছেন সুভাষ মুখোপাধ্যায় , গৌতম ঘোষ , প্রকাশ কর্মকার , শুভাপ্রসন্ন৷ রাজনৈতিক হুমকিকে পরোয়া না করেই ছুটে গিয়েছিলেন সে সময়ের বিধায়ক অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায়ও৷ এ মেলার থিম সং লিখেছেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়৷ সেই গান ও সৃজনের গান নিয়ে একটি গানের সংকলন প্রকাশ করেছিল এইচএমভি৷ সৃজন উত্সব নিয়ে তথ্যচিত্রও তৈরি হয়েছে৷ যা এক সময় দেখানো হয়েছিল নন্দনে৷ সৃজনের উন্মাদনা এমনই যে স্থানীয় গ্রামাঞ্চলে আত্মীয় স্বজনের ভিড় জমে যায় উত্সবের কারণে৷ উত্সবের লিফলেট সংগ্রহও বিশেষ বৈশিষ্ট৷ থাকে — এখানে বন্দুক নেই, হূদয় আছে৷ বাংলা ছাড়াও অসম , মণিপুর , গুজরাট , সিকিম , রাজস্থান , অরুণাচল , বিহার , ঝাড়খণ্ড এবং অবশ্যই বাংলাদেশের শিল্পীদের উপস্থাপনায় বর্ণময় হয়ে থাকে সৃজনের শিল্পপীঠ৷ তিন দিনের এই উত্সব যে এখন শুধু পুরুলিয়ার নয় , গোটা দেশের সমস্ত লোকশিল্পীদের৷ ছবি সৌজন্য : পার্থ আচার্যপুরুলিয়ার টিলা পাহাড়ের তিনটি শৃঙ্গ৷ তিনটি শিল্পপীঠ৷ বাইশ বছর ধরে সেখানেই হয়ে চলেছে বাংলার ভারত মেলা৷ বছরের তিন দিন৷ পার্থ আচার্যসৃজনভূমিতৈরি করা হয় অস্থায়ী আখড়া৷ যেখানে খড়ের বিছানায় বিশ্রাম নিতে পারবেন সকলেই৷ দু’বেলা খাবার ব্যবস্থা করা হয় শিল্পী , অতিথি , গ্রামের মানুষের জন্য৷

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: