(আনন্দবাজার)

রবিবারের সকাল আটটা। নিউ টাউনের পাঁচতারা হোটেলে তখনও ব্যস্ততার ছোঁয়া লাগেনি। রিসেপশনে খবর দিতে তিনি নেমে এলেন। পরনে থ্রি-কোয়ার্টার ট্রাউজার্স, গেঞ্জি। এবং বুকে এক কোণে ট্রেডমার্ক মাকড়সা ব্রোচ। সঙ্গী ফোটোগ্রাফারকে দেখে বললেন, ছবিও তুলবেন দেখছি। তা হলে তো পোশাকটা পালটাতে হয়। বলেই চলে গেলেন নিজের স্যুইটে। ফিরে এলেন দ্রুত। এ বারে থ্রি-পিস। গলায় টকটকে লাল স্কার্ফ। এবং আর একটা মাকড়সা ব্রোচ।

তিনি সেডরিক ভিলানি। বয়স ৪২। প্যারিসে অঁরি পঁয়েকারে ইনস্টিটিউট-এর ডিরেক্টর। গণিতে নোবেল প্রাইজ নেই, কিন্তু গ্ল্যামারে যা তার সমতুল, সেই ‘ফিল্ডস মেডেল’ বিজেতা। বাষ্প অবস্থায় তড়িৎযুক্ত কণা বা প্লাজমা-র বিশেষ ধর্ম— কেতাবি নাম ‘লানদাউ ড্যাম্পিং’— জটিল গণিতে ব্যাখ্যা করে পণ্ডিতদের নজর কেড়েছেন। তবে ও সব বর্ণনায় তাঁকে চেনা যাবে না।

আজকের দুনিয়ায় ফিজিক্সের যদি এক জন স্টিফেন হকিং থাকেন, তবে অঙ্কের আছেন সেডরিক ভিলানি। হ্যাঁ, গণিত চর্চা করেও জনমানসে খ্যাতিতে তিনি যেন এক জন রকস্টার। বক্তৃতা দিতে ঘুরে বেড়ান সারা পৃথিবী। তাঁর ভাষণে যতটা মুগ্ধ হয় মানুষ, ততটাই আকৃষ্ট হয় তাঁর কেতাদুরস্ত বেশভূষায়। যা দেখে লজ্জা পাবেন যে-কোনও হলিউ়ড অভিনেতা। দামি থ্রি-পিস এবং স্কার্ফের সঙ্গে সব সময় থাকে ভিলানির প্রিয় মাকড়সা ব্রোচ।

ব্রোচ হিসেবে মাকড়সাই পছন্দ কেন? সেটা একটা রহস্য! ভিলানি কাউকে ব্যাখ্যা করেননি আজ পর্যন্ত। করবেনও না কোনও দিন। সব রহস্যের সমাধান চাই বুঝি? ব্যাপারটাতে বেশ মজা পান তিনি— যখন দেখেন কোনও সাংবাদিক তাঁর কাছে এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা না পেয়ে নিজেই একটা উদ্ভট ব্যাখ্যা খাড়া করেন! ভিলানি বলেন, গণিতের কচকচির বাইরে থাকতে ওটা নাকি একটা কমিক রিলিফ!

তবে হ্যাঁ, মাকড়সা ব্রোচ ভিলানি এত ভালবাসেন, তাঁর সংগ্রহে আছে শ’খানেক। যেটা দেখলাম আমরা কোটের বুকে, সেটা নাকি আফ্রিকান এক বন্ধুর উপহার। ওই মহাদেশের মরুভূমিতে মেলে, এমন মাকড়সার নকল ওটা।

জিজ্ঞেস করলাম, কখন বুঝলেন গণিতজ্ঞ হবেন? বাবা-মা’র প্রেরণা ছিল?

ভিলানি জানালেন, না, তেমন কোনও মুহূর্ত আলাদা করে আসেনি। আর বাবা-মা তো কোনও কিছুর দিকে জোর করে ঠেলে দেওয়ার কথা ভাবতেই পারতেন না। ওঁরা দুজনেই ছিলেন স্কুলের শিক্ষক। পড়াতেন ফরাসি সাহিত্য। কাকা-জ্যাঠারাও শিক্ষা জগতের মানুষ। পড়াশুনোর ভাল পরিবেশ ছিল বাড়িতে। তবে গণিতে চলে যাওয়ার মূলে তাঁর ক্ষেত্রে অন্য কারণ ছিল হয়তো।

ছোটবেলায় ঘন ঘন ভুগতেন। এখন অবশ্য তিনি শারীরিক ভাবে যথেষ্ট ফিট। সাত বছর আগে ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর হওয়ার পর থেকে, ট্যুর বাদ দিলে এক দিনও অসুস্থ হয়ে ইনস্টিটিউটে গরহাজির থাকেননি। আর ছেলেবেলায়? প্রায় ৩০ শতাংশ দিন স্কুলে যেতে পারতেন না অসুস্থতার কারণে। হুটোপাটির খেলাধুলো বাদ। তার ওপরে ছিলেন দারুণ মুখচোরা। বাড়িতে-শুয়ে-থাকা এমন ছেলের পক্ষে গণিতকে ভালবেসে ফেলা বোধহয় স্বাভাবিক।

ফিল্ডস মেডেল পালটে দিয়েছে তাঁর জীবন। অনেকটা। এখন তাঁর পাবলিক লাইফ অনেকখানি।

ভাল লাগে? মনে হয় না গবেষণার সময় কমে যাচ্ছে?

না, বরং ভাল লাগে, যখন দেখেন সমাজে গুরুত্ব পাচ্ছেন। একটা উদাহরণ দিলেন। ফরাসি সরকার বিজ্ঞান গবেষণায় আর্থিক বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছেন। অনেকে মিলে প্রতিবাদ করে চিঠি দিয়েছেন সরকারকে। চিঠিতে তাঁর স্বাক্ষরের দাম বেড়ে গিয়েছে শুধু এ কারণে যে, তিনি ফিল্ড মেডালিস্ট, লোকে তাঁর নাম জানে। পাবলিক লাইফে থাকার জন্য মিডিয়া ট্রেনিংও নাকি নিয়েছেন।

মানে?

এই যেমন, ফরাসি হয়েও ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলা। এক কালে মুখচোরা হওয়া সত্ত্বেও এখন অনেক পাবলিক লেকচার দিয়ে বেড়ানো। এ সব এক-একটা স্কিল। রপ্ত করতে হয়।

ওঁকে জানালাম এই অধম সাংবাদিকের এক অপমানজনক অভিজ্ঞতার কাহিনি।

‘জানেন, সেটা ২০১০ সাল। হায়দরাবাদে ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব ম্যাথমেটিশিয়ানস-এ, যেখানে আপনি পেলেন ফিল্ডস মেডেল, সেখানে নিউ ইয়র্কে কুরান্ট ইনস্টিটিউট-এর প্রথিতযশা অধ্যাপক লুই নিরেনবার্গ-কে দেওয়া হল ‘চার্ন মেডেল’। ইন্টারভিউ নেওয়ার সময় ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি মনে করেন, ভিনগ্রহের জীবদের সঙ্গে যোগাযোগে গণিত-নির্ভর সিগনালই শ্রেষ্ঠ উপায়? ব্রহ্মাণ্ড গণিত-নির্ভর। যে-কোনও উন্নত সভ্যতা গণিত বা সংখ্যা শিখতে বাধ্য। সুতরাং, গণিতের ভাষায় কথা বলা কি যোগাযোগের শ্রেষ্ঠ উপায় নয়?

‘অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, প্রশ্ন শুনে নিরেনবার্গ বিরক্ত হলেন। ব্যঙ্গের সঙ্গে জবাব দিলেন, আপনার খবরের কাগজ বোধহয় ই.টি. নিয়ে খুব ভাবে? অপমানে আমি থ!’

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ভিলানির মন্তব্য: তা হলেই দেখুন গবেষকদের মিডিয়া ট্রেনিং দরকার কি না। আপনার প্রশ্নটা তো সংগত। নিরেনবার্গ কেন যে তাৎপর্য না বুঝে ওই রকম রিঅ্যাক্ট করেছিলেন, তা আমি বলতে পারব না। ইন্টারভিউয়ের সময় আপনার নিশ্চয়ই মনে ছিল কার্ল সাগানের ‘কনট্যাক্ট’ উপন্যাসের কাহিনি। যেখানে ই.টি.-দের তরফে প্রাইম নাম্বারে পাঠানো রেডিয়ো সিগনাল দেখেই নায়িকা জ্যোতির্বিজ্ঞানী বুঝেছে— ওই সংকেত মহাশূন্য থেকে আসা হাবিজাবি বিপ নয়, বরং বুদ্ধিমান কোনও প্রাণীর পাঠানো সংকেত। আমাদের ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞান-নির্ভর ফিল্ম দেখানো হয় বছরে কয়েক বার। ওখানে ওই ছবিটার স্ক্রিনিং হয়েছে।

গণিত নিয়ে প্রশ্নোত্তর, আর তাতে রামানুজন উঁকি দেবেন না, কখনও হয়? জানতে চাইলাম, ‘দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি’ হলিউডি ছবিটা দেখেছেন কি না। ভিলানি এখনও দেখেননি ছবিটি। প্যারিসে আসেনি। নানা জায়গায় রিভিউ পড়েছেন। তাঁর মনে হয়, হলিউডে ছবিটি তেমন কদর পাবে না, যেমন পেয়েছিল ‘আ বিউটিফুল মাইন্ড’ কিংবা ‘গুডউইল হান্টিং’।

কেন?

হলিউড গল্প চায়, সত্য চায় না। জন ন্যাশ-এর জীবন নিয়ে তৈরি ছবি ‘আ বিউটিফুল মাইন্ড’ অনেকটাই বানানো। আর ‘গুডউইল হান্টিং’ তো কল্পকাহিনিই। সে দিক থেকে ‘দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি’ তথ্য-নির্ভর, এবং রামানুজনের জীবনের অনেক কাছাকাছি। তাই হলিউডের ও-ছবি ভাল লাগবে না। ভিলানি কিছু দিন আগে পড়েছেন একখানি বই। ‘মাই সার্চ ফর রামানুজন’। লেখক আমেরিকায় এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেন ওনো। সেই পণ্ডিত, যিনি রামানুজনের বায়োপিকে গণিত উপদেষ্টা ছিলেন।

ওনো লিখেছেন তাঁর ছোটবেলার কথা। পড়াশুনোয় কতটা খারাপ ছিলেন তিনি, কী রকম বকা খেতেন মায়ের কাছে। তার পর গণিতের অধ্যাপক বাবার কাছে এক দিন শুনলেন শ্রীনিবাস রামানুজন নামে এক জনের কাহিনি। সেই গল্প পালটে দিল ওনো-র জীবন। গণিতকে ভালবেসে ফেললেন তিনিও। ‘ভাবুন তো এক বার’, বললেন ভিলানি, ‘কত দিন আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন মানুষটা, এত দিন পরেও এক জন ছাত্রকে এতখানি অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন তিনি। আচ্ছা, রামানুজনের স্ত্রী কেন প্রায় অর্ধ শতাব্দী আর্থিক কষ্টের মধ্যে জীবন কাটিয়েছিলেন?’

আমি নিরুত্তর।

আর এক জন। পুরো নাম গডফ্রে হ্যারল্ড (জি এইচ) হার্ডি। গত শতাব্দীর প্রাতঃস্মরণীয় গণিতজ্ঞ। নানা কারণে বিখ্যাত। তার মধ্যে একটা অবশ্যই রামানুজনকে ‘আবিষ্কার’। মাদ্রাজের পোর্ট ট্রাস্ট অফিসে যৎসামান্য মাইনের কেরানি রামানুজন তো তাঁর গণিতচর্চার (পেশা নয়, নেশা হিসেবে) ফলাফল জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন কত পণ্ডিতকে। কেউ উত্তর দেননি। ব্যতিক্রম ওই হার্ডি। চিঠি পড়ে তিনি থ। এমন প্রতিভা পচে মরছে কেরানিগিরি করে! বৃত্তি দিয়ে রামানুজনকে নিয়ে গিয়েছিলেন কেমব্রিজে। তার পর তো ইতিহাস। জিনিয়াসে জিনিয়াস চেনে।

পাণ্ডিত্য এবং ওই উপাখ্যান বাদ দিলেও হার্ডি খ্যাত নানা কারণে। তাঁর বই ‘আ ম্যাথমেটিশিয়ান’স অ্যাপোলজি’ হার্ডিকে দিয়েছে অমরত্ব। যার পাতায় পাতায় ফুটে উঠেছে তাঁর চরিত্র। তা কেমন? হ্যাঁ, গণিত গবেষণায় হার্ডি রীতিমত উন্নাসিক। ভালবাসেন গণিতের নান্দনিক দিক। বিমূর্তের সাধনা। পিয়োর ম্যাথমেটিক্স। যা কোনও কাজে লাগে না। মন মাতায় শুধু সৌন্দর্যে। আর অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিক্স? যা কাজে লাগে ব্রিজ বানাতে কিংবা যুদ্ধে? সে সব, হার্ডির মতে, ‘ইনটলারেব্‌লি ডাল’। অর্থাৎ, এলেবেলে।

ভিলানিও কি তাই মনে করেন?

একদম না! ওঁর মতে, ও রকম দৃষ্টিভঙ্গি তো ‘মনস্ট্রাস ওয়ে অব থিংকিং’। অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিক্সকে ও ভাবে খাটো করা ভুল। আসলে হার্ডির যুগে অনেক কিছু জানা ছিল না। যেমন জানা ছিল না, ওঁরই গবেষণা পরে কাজে লাগবে জিন বিশ্লেষণে। হার্ডির সেই বিখ্যাত গর্ব— কাজে লাগবে, এমন কোনও কিছু আমি জীবনে করিনি, আমার কোনও গবেষণায় মানুষের ন্যূনতম লাভ বা ক্ষতি কখনও হয়নি বা হবেও না— সে তো হাস্যকর শোনায় এখন।

হার্ডির কাজ ছিল নাম্বার থিয়োরিতে। মানে, ১, ২, ৩, ৪ ইত্যাদি সংখ্যার ধর্ম ঘাঁটাঘাঁটিতে। হার্ডি ভেবেছিলেন ও-কাজ কারও উপকারে লাগবে না। হায়, আজ যে রামের ই-মেল শ্যাম পড়ে ফেলতে পারছে না (পাসওয়ার্ড), কিংবা যদুর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে মধু টাকা আত্মসাৎ করতে পারছে না (পার্সোনাল আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার বা ‘পিন’), সে সব সুরক্ষা তো ওই নাম্বার থিয়োরির আশীর্বাদেই। ভিলানি বললেন, ‘এ সবের পরেও গণিতকে বিশুদ্ধ আর ব্যবহারিকে আলাদা করি কী করে? আমার মনে হয়, অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিক্স পিয়োর ম্যাথমেটিক্সের গ্ল্যামার বাড়ায়।’

‘বার্থ অব আ থিয়োরেম: আ ম্যাথমেটিকাল অ্যাডভেঞ্চার’। ২৭০ পৃষ্ঠার বই। লেখক ভিলানি। তাঁর মেজাজ-মর্জি টের পাওয়া যায় বইখানা হাতে নিলে। প্রচ্ছদে তিনি। গম্ভীর মুডে। পেছনের মলাটেও তিনি। এ বার ছবি পাগলাটে। ব্যাকড্রপ বলতে একখানা পেল্লায় ব্ল্যাকবোর্ড। তাতে একগাদা ফর্মুলা। অচেনা অক্ষর। দুর্বোধ্য চিহ্ন। হিজিবিজি। আর তার সামনে ভিলানি। শান্তশিষ্ট ভাবে দাঁড়িয়ে নয়। চার হাত-পা শূন্যে ছুড়ে লাফ দেওয়ার ভঙ্গিতে। বিদঘুটের ব্যাকড্রপে খ্যাপামি। এ বলে আমায় দেখ, তো ও বলে আমায়।

আর বইয়ের ভেতরটা? পাতা ওলটাতে ওলটাতে মনে পড়বেই দুজনের কথা। স্টিফেন হকিং, রজার পেনরোজ। নিজের দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম হকিং ভেবেছিলেন বিজ্ঞানের এমন একখানা জনপ্রিয় বই লিখবেন, যা বিক্রি হবে এয়ারপোর্টের বুক স্টলে। ১৯৮৮ সালে ছাপা সে বই ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম: ফ্রম বিগ ব্যাং টু ব্ল্যাক হোল’। ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম ও সম্ভাব্য মৃত্যুকাহিনি। সে বই লেখার সময় হকিং-এর পাবলিশার সতর্কবাণী শুনিয়েছিলেন— বইতে একটা ফর্মুলা মানে তার বিক্রি অর্ধেক কম! উপদেশ মেনে লেখা বই সুপারডুপার বেস্টসেলার। এ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে কোটি কোটি কপি।

হকিংয়ের বন্ধু পেনরোজ। এক সময় গবেষণাও করেছেন দুজনে। সেই পেনরোজ বই লিখলেন হকিং-এর পরের বছরই। ‘দি এম্পেরর’স নিউ মাইন্ড: কনসার্নিং কম্পিউটরস, মাইন্ডস অ্যান্ড দ্য ল’জ অব ফিজিক্স’। ৬০০ পৃষ্ঠার বইটির বিষয়ের ব্যাপ্তি বিশাল। রিলেটিভিটি, কোয়ান্টাম মেকানিক্স, কসমোলজি, কম্পিউটর সায়েন্স, নিউরোসায়েন্স,  আরও কত কী! মজার ব্যাপার, পাবলিশারের সতর্কবাণী এখানে উধাও। বিষয় ব্যাখ্যার জন্য ফর্মুলা তো যত্রতত্র আছেই, তার ওপর আছে পাতাজোড়া অঙ্ক। প্রকাশকের পরামর্শ ঠিক হলে যে বই কাটতির বদলে পোকায় কাটার কথা। বাস্তবে বিক্রি? পুরনো গাড়ি কিনবেন পেনরোজ, পাবলিশারকে ফোন করলেন, যদি সামান্য কিছু পাউন্ড মেলে রয়ালটি বাবদ। প্রকাশক জানালেন, যা রয়ালটি তিনি পাবেন, তাতে কয়েকটা নতুন গাড়ি কিনতে পারেন পেনরোজ!

বইয়ের বিক্রি বাড়াতে হকিং-এর প্রকাশকের উপদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন ভিলানিও। তবে তিনি পেনরোজ-এর চেয়েও দশ কাঠি সরেস। ‘বার্থ অব আ থিয়োরেম’ হাতে নিয়ে পাঠক ভিরমি খাবেন, আঁতকে উঠবেন। পাতায় পাতায় জটিল দুর্বোধ্য সব ফর্মুলা, অঙ্ক। কোথাও ছিটেফোঁটা নেই ওগুলোর ব্যাখ্যা। পড়তে গেলে হোঁচট খেতে হয় পদে পদে। বইখানা লানদাউ ড্যাম্পিং আবিষ্কারের আগের এবং পরের কাহিনি। সে হিসেবে বইয়ের সাব-টাইটেল হতে পারত ‘হাউ আই গট দ্য ফিল্ডস মেডেল’। কিন্তু ঠিক কী আবিষ্কারের জন্য ওই শিরোপা, তা জানতে পারবেন না পাঠক।

কেন লিখলেন এমন বই?

ভিলানির ঠোঁটের কোণে তেরচা হাসি। মনে হল প্রশ্নটা হাজার বার শুনেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা: ‘আমি তো গণিত ব্যাখ্যা করতে বই লিখিনি। আমাকে প্রায়ই প্রশ্ন করা হয়, গণিত গবেষণার অনুভূতিটা কী রকম? গণিতজ্ঞের দৈনন্দিন জীবন কেমন? তাঁর কাজ এগোয় কী ভাবে? বইতে আমি আমার মতো করে ও-সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। গবেষণার ফলাফল নয়, আমি বর্ণনা করেছি একটা ম্যাথমেটিকাল জার্নি, একটা খোঁজ। অজানায় ঝাঁপ দেওয়ার মুহূর্ত থেকে সেই তখন, যখন কোনও ফলাফল— একটা নতুন থিয়োরেম— বিখ্যাত জার্নালে ছাপার জন্য মনোনীত হচ্ছে, ততটা পথ কী রকম, তা বলার চেষ্টা করেছি। কেমন সে পথের কাঁটাগুলো? সন্দেহ, ঈর্ষা, উদ্বেগ, হতাশা আর সব শেষে সাফল্যের আনন্দ। গণিত নয়, গণিতজ্ঞের মনটা মেলে ধরার চেষ্টা করেছি আমি।’

ঠিক বলেছেন ভিলানি। মনে পড়ল ‘বার্থ অব আ থিয়োরেম’-এর একটা জায়গা। ২০০৯ সালের এক সন্ধ্যা। ইনস্টিটিউট থেকে ফিরেছেন ভিলানি। তিনি ঢুকে পড়লেন ওঁর ছেলে-মেয়ের ঘরে। দরজা বন্ধ, লাইট অফ। অন্ধকারে পায়চারি করছেন গবেষক। কয়েক মিটার দূরে কিচেনে ওঁর স্ত্রী ক্লেয়ার। গোটা পরিবারের ডিনার রেডি করায় ব্যস্ত। স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকায় কত ফারাক! স্ত্রী ব্যস্ত নর্মাল কাজে। স্বামী মত্ত অ্যাবনর্মালে। ভিলানি লজ্জিত। তবুও ডিনার সেরে ফের সেই অন্ধকার ঘরে। আবার পায়চারি। আবার মাথা খুঁড়ে মরা। গণিতজ্ঞের কাজই যে এমন। অন্ধকারে হাতড়ানো। সুন্দরকে ছুঁয়ে দেখার অপেক্ষায়।

কিন্তু, ওই যে পাতার পর পাতা জুড়ে হিজিবিজি ফর্মুলা, কোথাও কোনও ব্যাখ্যা নেই, ওগুলো কি জরুরি ছিল?

মূল ফরাসিতে যখন পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করছেন, তখন একটা সন্দেহ নাকি ভিলানির মনেও ছিল। প্রকাশক ছাপবে তো? অবাক হলেন, যখন ফরাসি প্রকাশনা সংস্থা বলল, ফর্মুলায় কুছ পরোয়া নেই। কেন? ওঁরা নাকি ওই দুর্বোধ্য চিহ্নগুলোকে বইয়ের ইলাস্ট্রেশন হিসেবে দেখছেন! যেন পাতায় পাতায় উদ্ভট কতকগুলো ছবি! চমৎকার যুক্তি। আরও অবাক কাণ্ড, পাবলিশার ওটাকে ‘ফিকশন’ হিসাবে বিক্রি করেছেন! বইটা ফ্রান্সে বেস্টসেলার হয়েছে। বারোটা ভাষায় অনুবাদ ছাপা হয়েছে। ফিকশন ঘোষিত না হলেও, ব্রিটেনে বইখানা সমাদর পেয়েছে। তবে আমেরিকান পাঠক বইটা সম্পর্কে তেমন উৎসাহ দেখায়নি।

কারণটা হতে পারে আমেরিকান মানসিকতা। রহস্যের বদলে যা চায় তার সমাধান। সে জন্য বোধ হয় ফর্মুলাগুলোকে স্রেফ ছবি হিসেবে দেখায় আপত্তি।

আমি বললাম, ‘আপনি দেখছি আইনস্টাইনের আপ্তবাক্যে বিশ্বাস করেন। তিনি বলেছিলেন, কোনও কিছু যতটা সরল করা যায়, ততটা করাই ঠিক, তার চেয়ে বেশি নয়।’

ভিলানি: ‘ঠিক তাই। আমি বোঝানোর চেষ্টা করলেই কি পাঠক লানদাউ ড্যাম্পিং বুঝত? যে যা-ই গ্ল্যামার আরোপের চেষ্টা করুক গণিতের ওপর, আমাদের মনে রাখা উচিত, ম্যাথ ইজ হার্ড।’

শেষ শব্দটার উচ্চারণে বিশেষ জোর। হার্ড নয়, হা-আ-র্ড।