‘কয়’। একখণ্ড বিচিত্র সুপারির টুকরো নিতান্ত শান্তশিষ্ট পান পাতায় জড়ানো। সেই খেয়ে কৌশিক পর্য্যন্ত ভিরমি খেলো! মাঝবয়সী দোকানিমাসির ঠোঁট, দাঁত এই ‘কয়’এর রসে দিবারাত্রি লাল টুকটুকে। সেই সঙ্গে হাসিটাও।

আমরা বিকেল হলেই সোহরার এই ছোট্ট খাওয়ার দোকানে জমিয়ে বসি। চা চলে। সঙ্গে এটা ওটা সেটা। আড্ডাও চলে বহুক্ষণ। যাবার আগে দোকানিমাসি, খাসি ভাষায় খলবলিয়ে কি সব বলে ওঠেন। তার রাঙা হাসির মোদ্যা ভাবটা বুঝে নিতে দুনিয়ার কোনো ভাষার দরকার হয় না। ‘রাতে আসবে তো?’

‘আসব,আসব।’ বাংলায় অভয় দিতে দিতে আমরা উঠে পড়ি।

কিন্তু ভবি ভুলবার নয়। ‘বখশিস’ না নিয়ে কোত্থাও যাওয়ার উপায় নেই। না দোকানির জন্য নয়। ক্রেতার জন্য। মাসি আমাদের ‘কয়’টা, কেকটা বাড়িয়ে দেন। ফ্রিতে। নিতেই হবে। ‘বখশিস!’

ভুলে গেছি কোন বেলায় এই আজব বখশিস মিলেছিল। বিকালে? নাকি রাত্তিরে? ভুলে গেছি খাসি আর বাংলার যুগলবন্দীতে কোনও দোভাষী তাল কেটেছিল কিনা হুট করে। রাস্তার উল্টোদিকে চিনাখাবারের শৌখিন রেস্তোরাঁয় পথ ভুলে গেছিলাম কিনা তাও মনে নেই আজ।

গোধুলিবেলার আলোয় পাহাড়চূড়ার স্বদেশ। পাহাড় টাহাড় সব অছিলা মাত্র। আমরা চার হাজার কিলোমিটার গাড়ি হাঁকিয়েছিলাম শুধু সেই দোকানিমাসির জন্য। তার ‘কয়’এর বখশিস, পাহাড়ি ঝরণার মত হাসি আর ভুবন ভোলানো সারল্যের জন্য। এইটুকুই যা স্বদেশ দর্শন।

দেশান্তরি হয়েছি কতবার। ঝিম মারা সন্ধ্যায় ভেবেছি যে ‘স্বদেশ’ বলে আছে কোনো কিছু নাকি সমস্তটাই সংস্কার? সমস্তটাই অভ্যাস? ভাবানো হয়েছে তাইই কি এসব ভাবছি?

কঠিন দর্শনের কথা জানিনা, কুটতর্কের মধ্যেও যাব না। শুধু হাঁটতে হাঁটতে একটা তিনকোনা রঙিন পাতা তুলে নেব। আশ্বিনের আগে নাকি ভাদ্র মাস। এই বিদেশে কিন্তু ‘পচা ভাদ্রের’ আবহাওয়া বেশ মনোরম। দামোদরের জলে সেতু ভেসে যায়। গাঁ গঞ্জ অজানা জ্বরে উজার হয়ে যায়। তিন কোনা পাতাটায় আঙুল বোলাতে বোলাতে আমি সংস্কার আর মগজধোলাইএর সব যুক্তিও ভাসিয়ে দিই গাঙের জলে। কন্যা আছে যে দেশে, স্বদেশ আমার সে দেশে।

সেকি আজকের কথা। পেটে ব্যাথা নিয়ে নাকি সারা সকাল শুয়ে আছে। দেব নাকি হাঁক একটা? তড়িঘড়ি ২৪০ ধরে লিন্টন থেকে কলেজ স্কোয়ার। মৌলালির জ্যামকে থোড়াই কেয়ার করে কন্যা একদম বটকৃষ্টো দত্তের মুর্তির নিচেয়। চোখে তার আগুন ঝরছে। ‘আজকেও লেট!’

সেই দিদিমার ছোটবেলার গল্পের মত। হাজারবার শুনেও গল্প শেষ হয় না। ‘সেই নারায়ণগঞ্জের গল্পটা বলো না দিদু।’ আশ্বিন ভাদ্র ভাসিয়ে দিয়ে কলকাতার মরসুমি বারিষে দুনিয়া আঁধার হয়ে আসত। কাগজের টুকরো গুলো ভাঁজে ভাঁজে ঢোকাতে ঢোকাতে দিদু বলত ‘দাড়িয়াবান্দা’ খেলার কথা। ‘ওফ দাদাটা যা পাজি ছিল! টানা ছাদ থেকে আমাদের পদ্মা দেখা যেত। ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে ঠিক আলসের দিকে উঠবে।’ তারপর এ কথা, সে কথা, কত কথা। কোন নিঃঝুম অতীতের টুকরো টুকরো ফ্যানা উড়ে যেত আমাদের দু কামরার ফ্ল্যাটের আনাচে কানাচে। ‘ছোটমামা কে ডাকতাম রাঙামামা বলে। সে ছিল এক মস্ত স্বদেশি।’

স্বদেশি?!

ততদিনে ‘আমি সুভাষ বলছি’ পড়ে ‘বলাকা’ থেকে আবৃত্তি করি। চার্লস টেগার্টকে বার তিনেক বোধহয় রাইটার্সেই মারি। লুকোনো সাবমেরিনে ভুবনজোড়া যুদ্ধের বাজারে জার্মানি থেকে জাপান পাড়ি দিই। এতে আমার প্রতিবেশির প্ররোচনাও কম ছিল না,

‘যে শুনেছে কানে/ তাহার আহ্বান গীত/ ছুটেছে সে নির্ভীক পরাণে/…. দিয়েছে সে বিশ্ব বিসর্জন/ নির্যাতন লয়েছে সে বক্ষ পাতি/ মৃত্যুর গর্জন শুনেছে সে সংগীতের মতো’

‘হ্যাঁ রে। রাঙামামা লুকিয়ে আসত মাঝে মাঝে। হাসত হো হো করে। প্রাণ খোলা হাসি। আর লেখাপড়াও জানত খুব।’

বাস রে! এই হলে না বিপ্লবী। আমি স্তম্ভিত হয়ে গল্প শুনতাম। এদিকে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামত আমাদের ঠাসাঠাসি দুকামরার ব্যালকনিতে।

ফ্রেডরিখ এভিন্যুএর ২৮৩৩ নম্বর বাড়ি। তারই লিভিংরুমে আপাতত ঠাঁই নিয়েছি। মারাঠি মেয়ে মৃন্ময়ীর কৃপায় এতটা হতে পেরেছে। আসলে যে ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকার কথা তার কন্ট্র্যাক্ট শুরু মাস পয়লায়। আর আমি এসে পৌঁছেছি হপ্তা খানেক আগেই। লিভিংরুমের একপ্রান্তে সেগুন কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো ফায়ারপ্লেস। এদিকটায় একটা মস্ত নীল রঙের সোফা, যা কিনা আপাতত আমার বিছানা। অন্য তিনটে ঘরের বাসিন্দা হচ্ছে মৃন্ময়ী, জেনা আর লরেন। তারা মাঝে সাঝেই হাসি মুখে জানিয়ে যাচ্ছে যে, আমি যেন দরকার মত সমস্ত নিয়ে নিই। ফ্রিজ ভরতি খাবার দাবার আছে। বিছানা বালিশ যথেষ্ট আছে। দ্বিধা যেন না করি একেবারে।

ফ্রেডরিখ এভিন্যুর নীলসোফার পাশে জানলা গুলো আধবোজা। বাইরে কিছুক্ষণ বাদে বাদেই বৃষ্টি হচ্ছে। ভেজা হাওয়া আমার পিঠে এসে লাগছে। সেই সিআইটি বিল্ডিংএর জলে ভেজা ব্যালকনির ছাঁটে আমি আচম্বিতে ফিরে তাকাচ্ছি। বার বার একই ভুল। না এদিনটা সেদিন নয় মোটেই।  বড়মাসি মোটেই গাইছে না, ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’, রান্নাঘর থেকে খিচুড়ির গন্ধ পাচ্ছি না কোথাও, নারায়ণগঞ্জের পদ্মার জল, ভাগিরথী হয়ে পৌঁছাচ্ছে না দিদুর কাগজের নৌকায়। এসব স্বদেশ আজ

ফ্রেডরিখ এভিন্যুর ভেজা হাওয়ার মত রয়ে আছে আমার আশে পাশে। মায়ের মত। আমার মায়ের মত।

আর আছে সেই দুব্যো রঙা কন্যা। কেমন করে সে যেন আমার সব স্বদেশেই দিব্যি উঁকি ঝুঁকি। তার ফুলকো ফুলকো আঙুল, তার শেফালিরঙা হাসি নিয়ে সে কলেজস্ট্রিটের উল্টো দিকে আধকোমর জল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রোজ। পরণে সাধাসিধে সবুজ রঙা কুর্তি। কপালে একফোঁটা টিপ, তাও কালে ভদ্রে।

তার কানের ঝিনুক ঝিনুক দুল আমার স্বদেশি হাওয়ায় টুপ টুপ করে দুলতে থাকে। আর আমি মরীয়া হয়ে ইন্টারনেটে আঙুল চালাই, ‘a one-way ticket to India’।

 

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: