বিজ্ঞান ডট অর্গ ডট ইন -এ স্বর্নেন্দু শীল লিখছেন জ্যামিতি নিয়ে।  ইউক্লিড থেকে রীম্যান। তারকার ছড়াছড়ি।

মুল লেখা গুলোর লিঙ্ক দিচ্ছি। তারপর পুনঃপ্রকাশ।

প্রথম পর্বে আমরা শুরু করেছিলাম জ্যামিতিতে আদৌ কিছু দেওয়া আছে কিনা এই প্রশ্ন দিয়ে, দেখেছিলাম যে ইউক্লিডীয় জ্যামিতির স্বতঃসিদ্ধগুলো আসলে সেই দেওয়া থাকা জিনিসগুলো। কিন্তু কি বলছে সেগুলো? প্রথম পর্বে শুধুই প্রথম স্বতঃসিদ্ধ কি বলছে দেখেছিলাম। দ্বিতীয় পর্বে দেখেছি জ্যামিতির বীজগাণিতিকরণ হয়ে কিভাবে কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক জ্যামিতি এল, আর এই স্থানাঙ্ক জ্যামিতির হাত ধরে আমরা দেখলাম যে দ্বিতীয়, তৃতীয় আর চতুর্থ স্বতঃসিদ্ধ কি বলছে।  ইউক্লিডীয় দূরত্ব অপেক্ষক আর ইউক্লিডীয় ইনার প্রোডাক্ট কেও চিনলাম সেই পর্বেই। তৃতীয় পর্বে সমস্তটা জুড়েই আমরা মাথা ঘামিয়েছি পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধ নিয়ে।  দেখলাম পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধ কি বলছে আর দেখেছি সেই স্বতঃসিদ্ধ কে পালটে নিলেও আমরা জ্যামিতি পাই, শুধু সেই জ্যামিতি আর ইউক্লিডীয় জ্যামিতি নয়, অনিউক্লিডীয় জ্যামিতি। 

লেখক পরিচিতিঃ স্বর্ণেন্দু শীল ইকোল পলিটেকনিক ফেডেরাল দে লসান-এ ডিফারেনশিয়াল ইক্যুয়েশন নিয়ে গবেষণা করে। এর আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জীনিয়ারিং এবং টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (ব্যাঙ্গালোর) থেকে অঙ্ক নিয়ে পড়াশুনো করেছে।

জ্যামিতির গোড়ার কথা : ইউক্লিড থেকে রীমান – ১

স্বর্নেন্দু শীল
ইকোল পলিটেকনিক ফেডেরাল দে লসান

প্রথম পর্ব

জ্যামিতি আমরা সকলেই কমবেশি পড়েছি, মজাও পেয়েছি… কিন্তু এই প্রশ্নটা কি আমরা কখনো ভেবেছি যে এই যে জ্যামিতিতে এত উপপাদ্য-সম্পাদ্য , এগুলোর জন্যে আমাদের ঠিক কোন জিনিসগুলো লাগে? মানে ঠিক কতটুকু কেউ আমাদের দিয়ে দিলেই জ্যামিতির বাকিটা আমরা নিজেরাই ভেবে ভেবে বের করে ফেলতাম, অনেক সময় লাগত হয়ত…কিন্তু পারতাম।

আমি জানি অনেকের কাছেই এই প্রশ্নটাই অদ্ভুত লাগবে, কারণ জ্যামিতি তো সবটাই ভেবে ভেবেই বের করা, এতে আবার দেওয়া কি আছে, কি ই বা দেওয়া থাকবে বা থাকতে পারে? আজকে আমরা এই প্রশ্নগুলো নিয়েই মাথা ঘামাব –

  • জ্যামিতিতে সত্যিই কিছু দেওয়া আছে কিনা?
  • আদৌ কিছু দেওয়া থাকার প্রয়োজন আছে কিনা?
  • যদি থাকে তবে কি দেওয়া আছে, কি দেওয়া থাকতে হয়?
  •  সবচেয়ে কম কতটুকু আমাদের দেওয়া থাকলেই আমরা জ্যামিতি বলতে আমরা যা বুঝি সেই সবটা করতে পারি ?

এই প্রশ্নগুলোকেই আমরা জ্যামিতির গোড়ার কথা বলব, গোড়া অর্থে এখানে ভিত … শুরু নয় মোটেই, কারণ এই প্রশ্নগুলোর কথা ভেবে কেউ জ্যামিতি শিখতে শুরু করেও না, করলে সেভাবে শেখাটা বেশ শক্তই হত ।  যাই হোক, প্রশ্ন যখন তুলেই ফেলা হয়েছে তখন ভাবনাচিন্তা শুরু- আর নিশ্চয়ই এর মধ্যেই আমাদের অনেকেরই মনে পড়েছে ইউক্লিডের[1] স্বতস্বিদ্ধগুলোর কথা ।  স্বতস্বিদ্ধগুলো যখন ধরে নিয়েই জ্যামিতি শুরু  করতে হত ,  তখন  সেগুলো দেওয়া থাকা জিনিসই,  given, a priori ।

আলোচনা গড়াবার আগে চট করে একবার দেখে নি এই স্বতস্বিদ্ধগুলো কি ?

  • যেকোনো দুটি বিন্দু দেওয়া থাকলে ওই দুটি বিন্দু দিয়ে যায় এরকম সরলরেখা আঁকা যায়
  • যেকোনো সরলরেখাংশকে ক্রমাগত বর্দ্ধিত  করে একটি সরলরেখা পাওয়া যায়
  • একটি বিন্দু ও একটি দূরত্ব দেওয়া থাকলে ওই বিন্দুকে কেন্দ্র করে ওই দূরত্বের সমান ব্যাসার্ধের বৃত্ত আঁকা যায়
  • সমস্ত সমকোণ পরস্পরের সমান
  • একটি সরলরেখা অন্য দুটি সরলরেখাকে ছেদ করলে যদি কোন একটি দিকে অন্তর্বর্তী কোণদ্বয়ের যোগফল ১৮০ ডিগ্রীর কম হয় , তবে সরলরেখাদুটিকে  অনির্দিষ্টভাবে বর্দ্ধিত করলে সেই দিকে মিলিত হবে

পাঁচ নম্বরটা খানিক খটমট, সেটায় আমরা পরে ফিরে আসব, কিন্তু প্রথম চারটেয় দেওয়া থাকার কি আছে? এইটাই মনে হচ্ছে না? অনেক কিছুর মতই এতেও ইউক্লিডের প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় যে তিনি বুঝেছিলেন বা আন্দাজ করেছিলেন যে এভাবে আলাদা করে এগুলো লেখার সুফল থাকলেও থাকতে পারে। আচ্ছা ২ নম্বরটাকে নিয়েই ভাবা যাক। আমরা একটা কাগজের উপর জ্যামিতি কষতে বসেছি, তাহলেই তো দ্বিতীয়টা সত্যি নয়। সরলরেখা  অসীম, অথচ কাগজটা একসময় শেষ হয়ে যাবে। আবার ধরুন কাগজে দুটো বিন্দু এঁকে  বিন্দু দুটোর মাঝখান দিয়ে কাগজটা ছিঁড়ে ফেললাম, ১ নম্বরটাও আংশিকভাবেও সত্যি নয় আর, মানে সরলরেখার জায়গায় সরলরেখাংশ চাইলেও নয়। আরও একটা উদাহরণ দি, একটা বৃত্ত আঁকুন, বৃত্তের ওপরে একটা বিন্দু নিন। এবার ওই বিন্দু থেকে ব্যাস টানলে সেটা উল্টোদিকে বৃত্তের যেখানে ছেদ করবে সেই বিন্দুটা আর আগের বিন্দুটাকে একটা সরলরেখাংশ দিয়ে যোগ করার চেষ্টা করুন। বৃত্তটা কম্পাস দিয়ে এঁকে থাকলে পারবেন না করতে, কারণ কম্পাস বসানোর জন্য বৃত্তের কেন্দ্রটা গেছে ফুটো হয়ে। তাহলে কিছু একটা দেওয়া আছেই, একদম ফালতু নয় ওগুলো। কিন্তু কি?

১ নম্বরটা আসলে বলছে যার ওপরে আমরা জ্যামিতি কষব সেই জিনিসটা অসীম, আর ২ নম্বরটা বলছে তাতে ছেঁড়া-ফাটা নেই, ফুটো-টুটোও নেই। অনেকক্ষণ ‘সেই জিনিসটা’ বলে চালাচ্ছি, এইবার সেই জিনিসটার একটা নাম দেব আমরা। এই জিনিসটাকে, যার ওপর জ্যামিতি করব আমরা তাকে বলে ইউক্লিডীয় স্থান, যার ইংরাজি নাম ইউক্লিডিয়ান স্পেস। স্থানের মাত্রার উপর অবশ্য নিয়ম-কানুন বিশেষ নেই, যেকোনো মাত্রা, মানে যেকোনো প্রাকৃতিক সংখ্যাই হতে পারে। দ্বিমাত্রিক ইউক্লিডীয় স্থান আমাদের ওই কাগজটার মতই, শুধু সবদিকে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত আর ফুটো-ছেঁড়া এমনকি কোথাও কোঁচকানো বা ভাঁজ থাকাও চলবে না। আর একটা জরুরী জিনিস আমি আপনাদের বলছি না এখন, কিন্তু সেটা বরং থাক। ৫ নম্বরের আলোচনায় আমরা আবার সেটায় ফিরে আসব, ততক্ষণ আপনারাও একটু ভাবুন সেইটা কি হতে পারে। ত্রিমাত্রিক ইউক্লিডীয় স্থান আমাদের চারপাশের ফাঁকা জায়গার মতনই, শুধু এও সবদিকে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত আর ফুটো-ছেঁড়া এমনকি কোথাও কোঁচকানো বা ভাঁজ থাকাও চলবে না। এখানে একটা বিশাল গোলমাল হবে, কারণ ত্রিমাত্রিক স্থানে ফুটো-ছেঁড়াটা আমরা বুঝতে পারলেও কোঁচকানো বা ভাঁজ থাকাটা কল্পনা করাও বেশ শক্ত আমাদের পক্ষে, আমরা ত্রিমাত্রিক জীব বলেই, কিন্তু তবু জ্যামিতির মত এত মজার একটা জিনিসের জন্যে সেই কষ্ট আমরা করলামই নাহয়।

পরের অংশে আমরা দেখব ৩ আর ৪ নম্বরটা কি বলছে।

(চলবে)
প্রচ্ছদের ছবি : উইকিপিডিয়া


[1] ইউক্লিড, বা ইউক্লিড অফ আলেকজান্দ্রিয়া একজন গ্রীক গণিতজ্ঞ, খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩-২৮৩ এই সময়কালে সক্রিয় ছিলেন বলে জানা যায় । Elements নামে তার লেখা একটি বিখ্যাত বইতেই আমরা স্কুলে যে সব জ্যামিতি করেছি সেই সবটা তো বটেই, বস্তুত বিংশ শতাব্দীর  দোরগোড়া পর্যন্ত মানুষ জ্যামিতি সম্পর্কে যা কিছু জানত, সেই সবটাই লিখিত আকারে প্রথম পাওয়া যায়, যদিও এত গোছানোভাবে না হলেও এই বইয়ের অনেক কিছুই এর আগের যুগের গণিতজ্ঞরা জানতেন, বিশেষত ভারতীয় ও আরব গণিতজ্ঞরা – ফলত এই বইটি মূলত একটি সংকলন… তবে বলে রাখা ভাল যে একান্তভাবেই ইউক্লিডের নিজের অবদান এরকম বহু কিছুই এই বইতে আছে বলেই মনে করা হয় – আর তা ছাড়া এত যৌক্তিকভাবে সাজানো, স্পষ্টভাবে লেখা এই বই যে শুধুমাত্র সংকলন হলেও ইউক্লিডের প্রতিভার মৌলিকত্বের দাবি একটুও কমে না।  মানব সভ্যতার ইতিহাসে মানুষের চিন্তাশক্তির সর্বকালের  সেরা কৃতিত্বগুলোর মধ্যে একটা এই বই ।

 

জ্যামিতির গোড়ার কথা : ইউক্লিড থেকে রীমান – ২

স্বর্নেন্দু শীল
ইকোল পলিটেকনিক ফেডেরাল দে লসান

দ্বিতীয় পর্ব

(প্রথম অংশের পর)

৩ নম্বর স্বতঃসিদ্ধ বলছে – একটি বিন্দু ও একটি দূরত্ব দেওয়া থাকলে ওই বিন্দুকে কেন্দ্র করে ওই দূরত্বের সমান ব্যাসার্ধের বৃত্ত আঁকা যায়। এখানে যা বলা হল সেটা বুঝতে এমনিতে কোন অসুবিধে নেই| কিন্তু ঠিক সেইজন্যেই এখানে যে আদৌ কিছু একটা ‘দেওয়া হল’ সেটা খেয়াল করা একটু মুশকিল। এখানে আসলে যেটা দেওয়া হল সেটা হল একটা স্কেল বা রুলার! মানে দূরত্ব মাপার একটা কিছু।

৪ নম্বর স্বতঃসিদ্ধ ভয়ানক গোলমেলে। এটা বলছে  –  সমস্ত সমকোণ পরস্পরের সমান। কিন্তু এর মানে কি? গোলমেলে ব্যাপারটায় যাচ্ছি, তবে তার আগে আরেকটা জিনিস খেয়াল করব| ৩ নম্বর স্বতঃসিদ্ধ যেমন দূরত্ম মাপার একটা কিছু দেয়, এখানে কোণ মাপার কিছু একটা লাগবে আমাদের। কিন্তু তাও বাকিটা পরিষ্কার নয়। সেটা পরিষ্কার করতে আমরা প্রথমে সমকোণের সংজ্ঞা খুঁজব| সেটা হলো এইরকম:

‘দুইটি সরলরেখা পরস্পরকে লম্বভাবে ছেদ করলে তাদের মধ্যবর্তী কোণ এক সমকোণ।’

এইবার বোধহয় খানিক পরিষ্কার হল ব্যাপারটা, তাই না? মানে ৪ নম্বর আসলে বলছে – যেকোনো দুইটি সরলরেখা পরস্পরকে লম্বভাবে ছেদ করলে তাদের উৎপন্ন কোণ সমান।

এখানে মনে হতে পারে যে আমরা একটা শব্দের বদলে আর একটা শব্দ বসালাম যার একই মানে। লম্বভাবে ছেদ করা কথাটার মানে কি? এর উত্তরে বলা যেতে পারে: দুটি সরলরেখা যখন পরস্পরকে ছেদ করে ও তাদের উৎপন্ন কোণের মান এক সমকোণ হয়, তখন ওই দুই সরলরেখাকে পরস্পরের উপর লম্ব (বা পরস্পরকে লম্বভাবে ছেদ করেছে) বলা হয়| তবে এই উত্তর দিলে আমাদের যুক্তিটা শুধুই গোল গোল ঘুরতে থাকবে। ‘লম্বভাবে ছেদ করা’ ব্যাপারটাকে অন্যভাবে বলতে হবে।

এই ফাঁকে সংজ্ঞা নিয়েও খানিক আলোচনা করে নেওয়া যাক। এতক্ষণ অবধি কোন সংজ্ঞা না বলেই আমরা কাজ চালাচ্ছিলাম। তার কারণ হলো – ইউক্লিডের এলিমেন্টস এ সংজ্ঞা আছে প্রথমেই, কিন্তু সারা বইতে কোথাও সেই সংজ্ঞাগুলোর কথা আর কখনো সেভাবে আসেনি। তাছাড়া বেশিরভাগ সংজ্ঞাই খুব গোলমেলে, যেভাবে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে সেইভাবেই বাকি বইতে সবসময় ব্যবহার হয়েছে তাও নয়।

আর একটা ব্যাপার হল, সংজ্ঞারা কিন্তু জ্যামিতিতে দেওয়া থাকা জিনিসগুলোর মধ্যে নয় ঠিক। ভালো সংজ্ঞা তৈরী করতে হলে, কোন জিনিসগুলো আগে সংজ্ঞায়িত করব, আর কোনগুলোর জন্য আগে সংজ্ঞায়িত জিনিসগুলোর সাহায্য নেব, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত খুবই জরুরী। কাজের অনেক সুবিধে হয় তাতে, বুঝতেও। অবশ্য জ্যামিতির অনেক জিনিসেরই নিখুঁত সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব না। যেমন বিন্দু। বিন্দুর এমন কোন সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভবই না যেটা থেকে বিন্দু কি এইটা কোন গোলমাল ছাড়া বোঝা যাবে। অথচ বিন্দু কি সে তো আমরা জানি একরকম। এই একরকম জানি অথচ সংজ্ঞা দেওয়া যায় না, এমন জিনিসগুলোকে অঙ্কে বলা হয় primitives বা primitive notions| আমরা বলব অসংজ্ঞায়িত প্রাথমিক ধারণা।

তা মোদ্দা কথাটা হল যে সংজ্ঞাই হোক কি  অসংজ্ঞায়িত প্রাথমিক ধারণাই হোক, এগুলো জ্যামিতিতে দেওয়া থাকা জিনিস নয়, এগুলো আমরা বেছে নিতে পারি। হিলবার্ট ১৮৯৯ সালে জ্যামিতিকে অন্যভাবে সাজালেন । এই প্রসঙ্গেই হিলবার্টের মন্তব্য – “আমরা বিন্দু, সরলরেখার জায়গায় চেয়ার, টেবিল, বীয়ারের মগ এইসব দিয়েও জ্যামিতি শুরু করতে পারতাম।” এর অর্থ হলো: কি দিয়ে শুরু করব তা সুবিধার জন্যে খুব জরুরী জিনিস, কিন্তু নীতিগতভাবে জরুরী নয়।

কিন্তু, স্বতঃসিদ্ধগুলো এই অসংজ্ঞায়িত প্রাথমিক ধারণাগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক| অর্থাৎ, সেগুলো একদমই দেওয়া থাকা জিনিস| সেগুলো আলাদা হলে যে জ্যামিতি আমরা পাব তা বেশ আলাদা হবে, ভীষণভাবেই আলাদা।

যাই হোক, ১,২, ৩ আর ৪ নম্বর স্বতঃসিদ্ধ কি বলছে আমরা দেখলাম। এও দেখলাম সংজ্ঞা ব্যাপারটা জ্যামিতিতে ভারী গোলমেলে। কিন্তু সংজ্ঞা না দিই, কাজ চালানো গোছের কিছু একটা তো বলতে হয়। সেটা আমরা বলব, কিন্তু তার আগে আমাদের অন্য একটা জিনিস একটু বুঝে নিতে হবে। অঙ্কে এটা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ- জ্যামিতির বীজগাণিতিকরণ। ঘাবড়ে যাওয়ার কিচ্ছু নেই, জিনিসটা আমাদের বেশ পরিচিত – স্থানাঙ্ক জ্যামিতি (coordinate geometry)। আর একটুখানি ভেক্টর বীজগণিত।

Jyamitir_gorar_kotha-2

বোঝার সুবিধের জন্য ধরুন, আমরা আছি R^3 তে, মানে ত্রিমাত্রিক ইউক্লিডীয় স্থানে। এই স্থানে যেকোনো একটা বিন্দুর অবস্থান আমরা তিনটে বাস্তব সংখ্যা দিয়ে বলতে পারব, যেখানে প্রথমটা x কো-অর্ডিনেট, দ্বিতীয়টা y আর তৃতীয়টা z। ওপরের ছবিতে এরকম তিনটে বিন্দু দেখছি আমরা, A, B আর C। আচ্ছা, OA সরলরেখার দৈর্ঘ্য কত? উত্তর আমরা জানি, OA^2 = a_1^2 + a_2^2 + a_3^2 । একই ভাবে, OB^2 = b_1^2 + b_2^2 + b_3^2 , OC^2 = c_1^2 + c_2^2 + c_3^2 , আর AC^2 = (a_1-c_1)^2 + (a_2-c_2)^2 + (a_3-c_3)^2 । আমরা আগে এই ফর্মুলাটাকে সুন্দরভাবে লিখে ফেলি| n দিয়ে লিখব কারণ n এর জন্যেও একই ফর্মুলা,

(d(a,b))^2 = (a_1-b_1)^2 + (a_2-b_2)^2 + \cdots + (a_n-b_n)^2

এইটাই আমাদের ৩ নম্বর স্বতঃসিদ্ধের আলোচনায় বলা স্কেল| এর নাম ইউক্লিডিয়ান দূরত্ব অপেক্ষক (euclidean distance function)। এর বেশ কিছু মজার প্রপার্টি আছে:

  • d(a,b) \geq 0, আর d(a,b) = 0 একমাত্র তখনই হবে যদি a=b হয়।
  • d(a,b) = d(b,a)
  • d(a,c) \leq d(a,b) + d(b,c), এইটার নাম ত্রিভুজ অসমতা বা triangle inequality.

স্থানাঙ্ক জ্যামিতির ভাষায় স্কেল কি, তা আমরা বুঝলাম। কিন্তু চাঁদা? আমাদের অনেকেরই মনে পড়বে ফিজিক্সে পড়া ডট প্রডাক্টের কথা।

a আর b এই দুই ভেক্টরের ডট প্রডাক্ট বা স্কেলার প্রডাক্ট বা ইনার প্রডাক্ট (inner product) হল:

(a,b) = a_1 b_1 + a_2 b_2 + \cdots + a_n b_n

a ও b এর পরস্পরের লম্ব হওয়া (যার মানে OA আর OB সরলরেখাদ্বয়ের পরস্পরের লম্ব হওয়া) আর (a,b) = 0, এই দুটো কথা একদমই তুল্যমূল্য (equivalent)। আরও কিছু জিনিস সত্যি এই আপাত অদ্ভুত প্রডাক্টটার ক্ষেত্রে:

  • (a,a) = d(0,a)^2 = |a|^2 দ্বিতীয় সমতাটিকে শুধু লেখার সুবিধার্থে করা নামকরণ ভাবতে পারেন| অথবা ভাবতে পারেন,ওটা a ভেক্টরের দৈর্ঘ্য বা মান| অঙ্কের ভাষায় যাকে বলে a এর নর্ম (norm of a)।
  • (a,b) = |a||b| cos \theta, যেখানে \theta ওই দুই ভেক্টরের মধ্যে উৎপন্ন কোণ।
  • (d(a,b))^2 = (a-b, a-b)

এই শেষেরটা খুব জরুরী, কারণ ওইটা বলছে কোণ মাপার চাঁদাটা দিয়ে দিলেই দূরত্ম মাপার স্কেলটাও পেয়ে যেতাম। তার আগেরটা অবশ্যই বলছে যে এই চাঁদাটা পুরোদস্তুর চাঁদা, যেকোনো কোণই মাপতে পারে, শুধু সমকোণ নয়।

তাহলে এখনো অবধি কি দাঁড়ালো? ইউক্লিডের প্রথম ৪ টে স্বতঃসিদ্ধ আমাদের দিল ইউক্লিডিয়ান স্পেস আর এই ইনার প্রডাক্টটা? ঠিক তাই !!

বিশ্বাস না হলে কষে দেখতে পারেন: দ্বিমাত্রিক ইউক্লিডীয় সমতলে, মানে R^2-তে, শুধুমাত্র ইনার প্রডাক্টের ফর্মুলাটা ধরে নিলেই স্কুলে করা দ্বিসামতলীয় জ্যামিতিটা (plane geometry) সব উপপাদ্য-রাইডার সমেত শুধু হিসেব কষায় দাঁড়িয়েছে| আর কিচ্ছু লাগবেনা।

পরের অংশে আমরা যাব সবচেয়ে ধাঁধালো স্বতঃসিদ্ধটায়।

(চলবে)
প্রচ্ছদের ছবি : উইকিপিডিয়া


বইয়ের প্রথমে ওই সংজ্ঞাগুলো সে কারণে অনেকেই মনে করেন যে ইউক্লিডের নিজের দেওয়া নয়, হেরন নামে আর একজন গণিতজ্ঞ বা তার কোন ছাত্রছাত্রী পরে এলিমেন্টস এ ওইগুলো জুড়ে দেন, তবে এ মত বিতর্কিত।

১৮৮২ সালে প্রকাশিত হয় পাশ ( Moritz Pasch ) এর বই  Vorlesungen über neuere Geometrie( বইয়ের নামের ইংরাজি তর্জমা lectures on modern geometry )। পাশ এই বইতে ইউক্লিডের জ্যামিতিকে সঠিক যৌক্তিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করালেন, primitives এর ধারণাও ওনারই দেওয়া। এই বইটির প্রভাব কত ব্যাপক আজকের ম্যাথেমেটিক্সে সেটা বোধহয় শুধু এইটুকু বললেই বোঝা যাবে যে এই বই পিয়ানোর ( Giuseppe Peano ) কাজকে প্রভাবিত করেছিল – শুধু জ্যামিতি নয়, গোটা অঙ্কশাস্ত্রের যৌক্তিক ভিত্তির দিকে প্রথম পদক্ষেপ এই বই।

১৮৯৯ সালে প্রকাশিত হিলবার্টের ( David Hilbert )  বই grundlagen der geometrie ( বইয়ের নামের ইংরাজি তর্জমা foundations of geometry ) অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলা সাড়াজাগানো একটি বই।

হিলবার্টের grundlagen der geometrie বই তে হিলবার্ট এই স্বতঃসিদ্ধগুলোকেও ঢেলে সাজিয়েছিলেন, এবং আরও অনেকেই এ কাজ করেছেন প্রায় কাছাকাছি বা পরবর্তী সময়ে, যেমন  Mario Pieri, G.D. Birkhoff, Oswald Veblen, Alfred Tarski এবং আরো অনেকে। কিন্তু এই কাজগুলো সবই ইউক্লিডের জ্যামিতি বা তার অংশবিশেষ পাওয়ার জন্যে লেখা axiomatic system. আলাদা স্বতঃসিদ্ধ হলে আলাদা জ্যামিতির আলোচনায় আমরা ফিরে আসব।

এইটা Elements এ একটা উপপাদ্য আসলে: ত্রিভুজের দুটি বাহুর যোগফল তৃতীয় বাহু অপেক্ষা বৃহত্তর।

জ্যামিতির গোড়ার কথা : ইউক্লিড থেকে রীমান – ৩

স্বর্নেন্দু শীল
ইকোল পলিটেকনিক ফেডেরাল দে লসান

তৃতীয় পর্ব

(দ্বিতীয় অংশের পর)

এইবারে আমরা ঢুকব ইউক্লিডের পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধের আলোচনায়। একবার দেখে নি কি বলছে এই স্বতঃসিদ্ধ।

একটি সরলরেখা অন্য দুটি সরলরেখাকে ছেদ করলে, যদি কোন একটি দিকে অন্তর্বর্তী কোণদ্বয়ের যোগফল দুই সমকোণের কম হয়, তবে সরলরেখাদুটিকে অনির্দিষ্টভাবে বর্ধিত করলে সেই দিকে মিলিত হবে।

ইউক্লিড ভেবেছিলেন যে এটা একটা উপপাদ্য। অর্থাৎ, এটাকে অন্য স্বতঃসিদ্ধগুলো থেকে প্রমাণ করা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কেউ এটা প্রমাণ করতে পারেনি। এই প্রমাণ করার চেষ্টার মধ্যে দিয়েই একদিন বোঝা গেল যে এটাও জ্যামিতিতে একটা দেওয়া জিনিস। অন্য স্বতঃসিদ্ধগুলো থেকে আসে না। কিভাবে বোঝা গেল, সেটা বুঝতে আমাদের কয়েকটা সংজ্ঞা জানতে হবে।

১. সরলরেখা বা লাইন — আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি: যে সংজ্ঞা আমরা এখানে দেখব, তা গাণিতিকভাবে নিখুঁত কোন সংজ্ঞা নয়। বস্তুত কোন সংজ্ঞাই নয়। জ্যামিতিতে বিন্দুর মতই সরলরেখাও একটা অসংজ্ঞায়িত ধারণা। তবু সেই ধারণাটাকে বুঝতে আমরা কিছু একটাকে, যাকে এই ধারণাটার ব্যাখ্যা বলা যেতে পারে, সংজ্ঞা বলে চালাব।

যেকোনো দুইটি বিন্দুর মধ্যে হ্রস্বতম দূরত্বের পথটিকে ওই দুইটি বিন্দু দিয়ে যাওয়া সরলরেখাংশ বলা হয়। যেকোনো সরলরেখাংশকে দুইদিকে অসীমভাবে বর্ধিত করলে একটি সরলরেখা পাওয়া যায়।

২. সমান্তরাল সরলরেখা বা প্যারালাল লাইন — এটা ইউক্লিডেও যা, আজও সেই সংজ্ঞাটাই ব্যবহার করি আমরা। এই সংজ্ঞাটা দেখায় কতটা দূরদর্শী ছিল ইউক্লিডের প্রতিভা।

একই তলে অবস্থিত দুটি সরলরেখাকে উভয়দিকে অসীমভাবে বর্ধিত করলে, যদি কোন দিকেই তারা পরস্পরকে ছেদ না করে, তাহলে এই সরলরেখাদ্বয়কে পরস্পরের সমান্তরাল বলা হয়।

এবার ফিরে যাই ইতিহাসে। পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধর ইতিহাস। আগেই বলেছি বহু শতাব্দীর বহু গণিতজ্ঞ চেষ্টা করার পরেও কেউই এটা প্রমাণ করতে পারেন নি। শেষ পর্যন্ত, ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ নিকোলাই লোবাচেভস্কি নামে এক রাশিয়ান গণিতজ্ঞ ও জানোস বোলেয়াই নামে এক হাঙ্গারিয়ান গণিতজ্ঞ দুজনে প্রায় একই সময়ে এই সমস্যাটার নিষ্পত্তি করলেন।[১]

কি নিষ্পত্তি? সেটা বুঝতে আমাদের দেখতে হবে তাঁরা ঠিক কিভাবে ইউক্লিডের পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধটা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। মজার কথা হলো, পদ্ধতিটা ইউক্লিডেরই উদ্ভাবন বলে মনে করা হয় — স্ববিরোধের সাহায্যে প্রমাণ (proof by contradiction)। ব্যাপারটা এরকম:

  • আমি যা প্রমাণ করতে চাইছি, তার উলটোটা সত্যি বলে ধরে নিয়ে শুরু করব।
  • তারপর তার থেকে আর কি কি প্রমাণ হয়, সেটা দেখব।
  • যদি এমন কিছু প্রমাণ করে ফেলি যা যৌক্তিকভাবে অসম্ভব, তাহলে আমাদের প্রথম ধরে নেওয়াটা সত্যি হতে পারে না। যেহেতু যা প্রমাণ করতে চাইছি তার উলটোটা ধরে নিয়েছিলাম, যা প্রমাণ করতে চাইছি, সেটা সত্যি হতেই হবে।

যেমন ধরা যাক, কিছু একটা বক্তব্য x-কে প্রমাণ করতে চাই। তার উলটোটা, যাকে অঙ্কের ভাষায় বলে, x কমপ্লিমেন্ট, সেটাকে সত্যি বলে ধরে নিলাম। তার থেকে ধরুন প্রমাণ করে ফেললাম, ২ < ২। যেহেতু ২ < ২ অসম্ভব, তাই প্রমাণ হয়ে গেল যে x সত্যি।

এবার পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধের একটা তুল্যমূল্য প্রতিপাদ্য আছে। এর নাম প্লেফেয়ারের স্বতঃসিদ্ধ।

একটি সরলরেখা এবং ওই সরলরেখায় আপতিত নয় এমন একটি বিন্দু দেওয়া থাকলে, ওই বিন্দু দিয়ে ওই সরলরেখার সমান্তরাল করে একটি এবং একটিমাত্র সরলরেখা টানা যায়।

এইটা আর পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধ যে তুল্যমূল্য, তা বোলেয়াই ও লোবাচেভস্কির অনেক আগে থেকেই জানা ছিল। কেন তুল্যমূল্য, তা আপনারাও একটু ভাবলেই বুঝতে পারবেন। পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধ বলছে, একটি সরলরেখা অন্য দুটি সরলরেখাকে ছেদ করলে, যেদিকে অন্তর্বর্তী কোণদ্বয়ের যোগফল দুই সমকোণের কম, সেদিকে মিলিত হতে বাধ্য। তার মানে, সরলরেখা দুটি সমান্তরাল হলে, ছেদকের দুদিকেই অন্তর্বর্তী কোণদ্বয়ের যোগফলকে ঠিক দুই সমকোণ হতে হবে। আর তাই, একটি সরলরেখা ও একটি বিন্দু দেওয়া থাকলে:

  • বিন্দুটা থেকে সরলরেখাটির ওপর লম্ব টানব প্রথমে।
  • তারপর সেই লম্বটির উপর আর একটি লম্ব টানব বিন্দুটা দিয়ে।

এই দ্বিতীয় লম্বটিই ওই বিন্দু দিয়ে যাওয়া সমান্তরাল সরলরেখাটি, যা আমরা খুঁজছি। নিচের ছবি দেখলেই বুঝবেন ইউক্লিডীয় দ্বিসামতলীয় জ্যামিতিতে কেন এইটা হবে।

fifth_postulate

লোবাচেভস্কি ও বোলেয়াই এই তুল্যমূল্য প্রতিপাদ্যটারই উলটো ধরে নিয়ে শুরু করেছিলেন। এই প্রতিপাদ্যটার উলটো কি? যেহেতু প্রতিপাদ্যটা বলছে এক এবং একটিমাত্র সমান্তরাল সরলরেখা টানা যায় তাই তার উলটো হওয়া উচিৎ এরম:

একটি সরলরেখা এবং ওই সরলরেখায় অপতিত নয় এমন একটি বিন্দু দেওয়া থাকলে, ওই বিন্দু দিয়ে ওই সরলরেখার সমান্তরাল করে হয় একটিও সরলরেখা টানা যায় না, অথবা একাধিক সরলরেখা টানা যায়।

তা, ওঁরা দুজনেই শুরু করেছিলেন একাধিক টানা যায়, এইটা ধরে নিয়ে। উদ্দেশ্য ছিল ইউক্লিডের বাকি চারটে স্বতঃসিদ্ধ আর এই একাধিক সমান্তরাল সরলরেখা টানা যাবে, এইটা ধরে শুরু করে একের পর এক উপপাদ্য প্রমাণ করে যাবেন, যতক্ষণ না কোন যৌক্তিক স্ববিরোধ (logical contradiction) খুঁজে পান। দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেছিলেন দুজনেই। কেউ কারও কাজের কথা জানতেনও না। মোটামুটি একই সময়ে দুজনেই থেমে যান। এবং না, দুজনের কেউই পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধ প্রমাণ করতে পারেন নি।

তবে থেমে গেলেন কেন? কারণ দুজনেই এক আশ্চর্য কাজ করে ফেলেছিলেন। যৌক্তিক স্ববিরোধ খুঁজতে খুঁজতে তাঁরা দুজনেই একেবারে নতুন জ্যামিতি তৈরি করে ফেলেছিলেন। ইউক্লিডীয় জ্যামিতির মতই তা, আর তাতে কোন স্ববিরোধও নেই। শুধু আছে একটা কিন্তু। কিন্তু কি? তাদের তৈরি করা জ্যামিতিতে উপপাদ্যগুলো যা বলছে, সেগুলো ইউক্লিডীয় জ্যামিতির সাথে মেলে না বেশিরভাগই।

কিরকম? ধরুন, ইউক্লিডীয় জ্যামিতির একটা উপপাদ্য:

ত্রিভুজের তিনটি কোণের সমষ্টি সর্বদা দুই সমকোণের সমান।

লোবাচেভস্কি ও বোলেয়াইয়ের জ্যামিতিতে এই উপপাদ্যটা আর সত্যি নয়। তবে এরকমই একটা উপপাদ্য আছে:

ত্রিভুজের তিনটি কোণের সমষ্টি সর্বদা দুই সমকোণের কম।

এখানে মনে হতে পারে, এই তো এই একটা অসম্ভব জিনিস! এই তো পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধ প্রমাণ হল! না, তা হল না, কারণ এটা যৌক্তিকভাবে অসম্ভব কিছু না। আমরা খাতার পাতায় ত্রিভুজ এঁকে কোণ মেপে দেখলে দুই সমকোণ বেরোয় ঠিক, তাই এই উপপাদ্যটা অদ্ভুত হতে পারে। কিন্তু ২ < ২, এটা যেমন যৌক্তিকভাবে অসম্ভব (logical impossibility), অর্থাৎ কোন নির্ভুল যুক্তিতেই অমন একটি প্রতিপাদ্য সত্যি হতে পারে না, তেমন কিছু নয়।

কিন্তু আমাদের রোজকার অভিজ্ঞতার সাথে ওনাদের জ্যামিতির এরকম বহু উপপাদ্যই মিলছিল না। সে এক আশ্চর্য নতুন জগৎ! এতটাই আলাদা জ্যামিতি আবিষ্কার করেছিলেন তাঁরা যে ঠিক কি ঘটেছে সেটা বুঝে উঠতে খানিক সময় লেগেছিল। ১৮৪৮ সাল থেকে গণিতজ্ঞরা এই নিয়ে ভীষণভাবে মাথা ঘামাতে শুরু করেন। এক সময় ফেলিক্স ক্লেইন প্রমাণ করলেন যে, এই জ্যামিতিগুলি যৌক্তিকভাবে স্ববিরোধমুক্ত যদি এবং কেবলমাত্র যদি ইউক্লিডীয় জ্যামিতি যৌক্তিকভাবে স্ববিরোধমুক্ত হয়।

সমস্তটা বুঝে উঠতে ইতিহাসকে আরো অপেক্ষা করতে হয়েছিল, রীমানের প্রতিভার জন্য। ওনারা যে জ্যামিতিগুলো আবিষ্কার করেছিলেন সেগুলোকে বলে অধিবৃত্তীয় জ্যামিতি (hyperbolic geometry)। পরে, ইউক্লিডীয় জ্যামিতির থেকে আলাদা কিন্তু এগুলোর থেকে অন্যরকম আরও জ্যামিতি আবিষ্কার হয়, সেগুলোকে বলা হয় উপবৃত্তীয় জ্যামিতি (elliptic geometry)। আর ইউক্লিডীয় জ্যামিতির থেকে আলাদা এই সমস্ত জ্যামিতিগুলোকে একসাথে বলা হয় অনিউক্লিডীয় জ্যামিতি (non euclidean geometry)।

পরের অংশে আমরা দেখব এই জ্যামিতিগুলো কেন এমন অদ্ভুত আর এরা কিই বা বলছে।

 

[১] বোলেয়াই তাঁর আবিষ্কারের কথা যখন গাউস (Karl Frederick Gauss) কে জানান, ততদিনে গাউস নিজেও এই আবিষ্কার করেছিলেন। যদিও এ নিয়ে তাঁর কোন কাজ কখনো প্রকাশিত হয়নি।

জ্যামিতির গোড়ার কথা : ইউক্লিড থেকে রীমান – ৪

[ আগে যা হয়েছে: প্রথম পর্বে আমরা শুরু করেছিলাম জ্যামিতিতে আদৌ কিছু দেওয়া আছে কিনা এই প্রশ্ন দিয়ে, দেখেছিলাম যে ইউক্লিডীয় জ্যামিতির স্বতঃসিদ্ধগুলো আসলে সেই দেওয়া থাকা জিনিসগুলো। কিন্তু কি বলছে সেগুলো? প্রথম পর্বে শুধুই প্রথম স্বতঃসিদ্ধ কি বলছে দেখেছিলাম। দ্বিতীয় পর্বে দেখেছি জ্যামিতির বীজগাণিতিকরণ হয়ে কিভাবে কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক জ্যামিতি এল, আর এই স্থানাঙ্ক জ্যামিতির হাত ধরে আমরা দেখলাম যে দ্বিতীয়, তৃতীয় আর চতুর্থ স্বতঃসিদ্ধ কি বলছে।  ইউক্লিডীয় দূরত্ব অপেক্ষক আর ইউক্লিডীয় ইনার প্রোডাক্ট কেও চিনলাম সেই পর্বেই। তৃতীয় পর্বে সমস্তটা জুড়েই আমরা মাথা ঘামিয়েছি পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধ নিয়ে।  দেখলাম পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধ কি বলছে আর দেখেছি সেই স্বতঃসিদ্ধ কে পালটে নিলেও আমরা জ্যামিতি পাই, শুধু সেই জ্যামিতি আর ইউক্লিডীয় জ্যামিতি নয়, অনিউক্লিডীয় জ্যামিতি। এই পর্বে আমরা অনিউক্লিডীয় জ্যামিতির অদ্ভুত অথচ মজার জগতটাকে চিনব। ]

( তৃতীয় অংশের পর )

অনিউক্লিডীয় জ্যামিতি – গোলকের উপরে কীভাবে সরলরেখা আঁকব?

অনিউক্লিডীয় জ্যামিতিগুলো আসলে কি বলছে এইটা বুঝতে আমরা প্রথমে শুরু করব আপাতভাবে একদম অন্য কিছু প্রশ্ন থেকে। আমরা প্রথমে দেখব যে গোলকের উপরিতলে আমরা যদি জ্যামিতি করতে চাই, কেমন দেখতে হবে সেই জ্যামিতি? আমাদের কিন্তু মাথায় রাখতে হবে যে জ্যামিতিটা গোলকের উপরিতলেই হওয়া চাই ।  কোন কিছু, যেমন ধরা যাক কোন রেখা যদি ওই তলটা ছেড়ে বেরিয়ে যায় বা গোলকটা ফুঁড়ে চলে যায় তাহলে সেইটা এই জ্যামিতির  অংশ নয় আর।

geodesicfinalcorrectedcaptionfinal

ধরা যাক, একটা গোলকের উপরে একটা ‘সরলরেখা’ আঁকব আমরা, শুরু করব সরলরেখাংশ দিয়ে। পৃথিবীর  অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশের মতই  গোলকটার সবচেয়ে উপরের বিন্দুটাকে (উপরের ছবিতে N বিন্দু) আমরা গোলকটার উত্তর মেরু, সবচেয়ে নিচের বিন্দুকে দক্ষিণ মেরু (উপরের ছবিতে S বিন্দু), ঠিক পেট বরাবর আড়াআড়ি যাওয়া বৃত্তকে নিরক্ষরেখা  ( উপরের ছবিতে ABMA’M’A বৃত্ত ) আর উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুকে লম্বালম্বি জুড়ছে যে অর্ধবৃত্তগুলো তাদেরকে দ্রাঘিমারেখা (উপরের ছবিতে NL’AS আর NLBS দুটো দ্রাঘিমারেখা) বলব।

এইবার ধরা যাক নিরক্ষরেখার উপরে আমরা দুটো  আলাদা বিন্দু  নিয়েছি  আর তাদের মধ্যে দিয়ে যাওয়া ‘সরলরেখা’ টা আঁকতে চাইছি।  ধরা যাক A আর Bবিন্দু দুটোর কথা। ওই বিন্দুদুটোর  মধ্যে  হ্রস্বতম  দূরত্বের পথ কোনটা?

একটু ভাবলে সহজেই বোঝা যাবে যে নিরক্ষরেখা বরাবর যে  দুটো বৃত্তাংশ ওই বিন্দু দুটোর মধ্যে দিয়ে গেছে, অর্থাৎ একটা পথ যেটা A বিন্দু থেকে শুরু হয়ে অন্যটায় (B বিন্দুতে) পৌঁছেছে (AQB বৃত্তাংশটা), আর একটা পথ  ঘুরিয়ে নাক দেখানোর মত করে প্রায় গোটা গোলকটা ঘুরে এসে অন্য বিন্দুটায় পৌঁছেছে (AM’A’MB বৃত্তাংশটা), এই দুটো পথের যেটার দৈর্ঘ্য কম সেইটা, অর্থাৎ AQB বৃত্তাংশটা।  গোলমেলে লাগছে?  ওই দুটো বিন্দুকে যোগ করা সরলরেখার (সাধারণ অর্থে, মানে APB সরলরেখাংশটা) অংশটার দৈর্ঘ্য তো অবশ্যই আরও কম। ঠিকই, কিন্তু মুশকিল হল ওই সরলরেখাটা গেছে গোলকটাকে ফুঁড়ে, ফলত গোলকের উপরিতল ছেড়ে বেরিয়ে গেছে সেটা, তাই ওটা গোলকের উপরিতলটার উপর ‘সরলরেখাংশ’ তো দূর, কোনরকম ‘রেখা’ ই নয়। একবার এই ধাঁধাঁটা কেটে গেলেই উপরিতলের পথগুলোর মধ্যে কেন এই পথটাই হ্রস্বতম বোঝা কঠিন নয়, উৎসাহীরা এমনকি একটা বল আর সুতো নিয়ে হাতেকলমে মিলিয়েও নিতে পারেন। অবশ্যই গাণিতিকভাবেও প্রমাণ করা সম্ভব এটা, কিন্তু আমরা সেই অঙ্কের কচকচিতে ঢুকব না

মহাবৃত্তরাই গোলকের উপরিতলের জ্যামিতিতে ‘সরলরেখা’!

এইবারে আমরা  দেখব Aআর B দিয়ে যাওয়া ‘সরলরেখা’ টা  কোনটা?  AQB বৃত্তাংশটাকে  দুদিকে  অসীম  বর্ধিত করলে সরলরেখাটা পাব, তাই নিরক্ষীয় বৃত্তটাই এই সরলরেখা।  বস্তুত ঠিক একই ভাবে গোলকের উপরিতলে যেকোন দুটো বিন্দু দিয়ে যাওয়া ‘সরলরেখা’ টা হবে গোলকের কেন্দ্রবিন্দুকে কেন্দ্র করে ওই  বিন্দু দুটো দিয়ে   যাওয়া বৃত্তটা … এইরকম বৃত্তগুলোকে  বলা হয় মহাবৃত্ত (great circle)।

অর্থাৎ, মহাবৃত্তরাই গোলকের উপরিতলের জ্যামিতিতে ‘সরলরেখা’!

কিন্তু, এই ‘সরলরেখা’ কি আমাদের পরিচিত সরলরেখা?

অর্থাৎ এরই মধ্যে আমরা এমন কিছু ‘সরলরেখা’ পেয়েছি যাদের সাথে  সরলরেখা বলতে   যা বুঝি তার বিস্তর ফারাক… প্রথমত, এরা আদৌ ‘সোজা’ নয়, দিব্যি বাঁকা; দ্বিতীয়ত,  ‘ অসীম বর্ধিত’ করা সত্ত্বেও এরা আদৌ অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত নয়, বদ্ধ ( bounded)। এই দ্বিতীয়টায় অবশ্য  অবাক  হওয়ার সত্যিই কিছু নেই, কারণ আমাদের জ্যামিতিক স্থানই ( গোলকের উপরিতল) এক্ষেত্রে বদ্ধ।

আপনাদের মনে থাকতে পারে যে প্রথম পর্বে ( এখানে দেখুন ) বলেছিলাম যে,  যার ওপরে আমরা জ্যামিতি কষব সেই জিনিসটা অসীম,  কিন্তু এখানে দেখছি যে বদ্ধ (অর্থাৎ সসীম) জিনিসের উপরেও আমরা জ্যামিতি কষতে পারি। সেটা কিভাবে সম্ভব? আমরা প্রথম পর্বে বলেছিলাম ইউক্লিডীয় জ্যামিতির কথা। ইউক্লিডীয় স্থান খাতার পাতার মত সামতলিক (flat), আর তাতে আঁকা-বাঁকা,  উঁচু-নীচু, ঢেউ খেলানো কিচ্ছু নেই।  ইউক্লিডীয় স্থান সামতলিক বলেই  তার উপরের সরলরেখা  অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু অনিউক্লিডীয় স্থানে, যেমন ধরা যাক গোলকের উপরিতলে,  সেরকম যে হতেই হবে তার কোন মানে নেই। অনিউক্লিডীয় জ্যামিতির আবিষ্কারই স্থানের ‘বক্রতা’ (curvature)-র প্রশ্নটাকে  সামনের সারিতে নিয়ে এল।

প্রসঙ্গত, বিভিন্ন ধরণের জ্যামিতিতে ‘সরলরেখা’ রা, সাধারণ অর্থে সরলরেখা বলতে যা বুঝি তার থেকে বেশ আলাদা হতে পারে এইটা বোঝা যাওয়ার পর  এদের একটা নাম দেওয়া হল,  সাধারণ সরলরেখার থেকে আলাদা করে বোঝার জন্য। এদেরকে বলে জিওডেসিক (geodesic)। সাধারণ অর্থে সরলরেখারাও কিন্তু জিওডেসিক, তারা ইউক্লিডীয় স্থানের জিওডেসিক।

গোলকের উপরে ত্রিভুজের তিনকোণের সমষ্টি কি ১৮০ ডিগ্রী?

কিন্তু এই যে গোলকের উপরিতল কে অনিউক্লিডীয় স্থান বললাম, দেখেই নেওয়া যাক এর উপরের জ্যামিতি সত্যিই অনিউক্লিডীয় কিনা। কিভাবে দেখব? ইউক্লিডীয় জ্যামিতিতে ত্রিভুজের তিনটে কোণের যোগফল দুই সমকোণ, তাই প্রথমে আমরা দেখব এই জ্যামিতিতে ‘ত্রিভুজ’-এর তিনটে কোণের যোগফল কত।  কোণ মাপব কি করে? দুটো বক্ররেখা যেখানে ছেদ করেছে, সেই বিন্দুতে বক্ররেখা দুটোর স্পর্শক (tangent)  টানব, স্পর্শকদুটোর মধ্যে উৎপন্ন কোণই বক্ররেখাদুটোর মধ্যের কোণ। প্রসঙ্গত বলে রাখি যে অনিউক্লিডীয় জ্যামিতি আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই এই পদ্ধতিটা জানা। ইউক্লিডীয় জ্যামিতিতে দুটো বক্ররেখার মধ্যেকার কোণ এভাবেই মাপা হয়।

এরপর আর বুঝতে একটুও অসুবিধে হওয়ার কথা নয় যে গোলকের উপরিতলে প্রতিটা দ্রাঘিমারেখা  নিরক্ষরেখাকে লম্বভাবে ছেদ করেছে ( উপরের ছবিতে NL’AS আর NLBS দ্রাঘিমারেখাদুটো যথাক্রমে Aআর B বিন্দুতে নিরক্ষরেখার ওপর লম্ব )। এখন নিরক্ষরেখার ওপরে যেকোন দুটো আলাদা  বিন্দুকে   আর উত্তরমেরুকে তৃতীয়  শীর্ষবিন্দু ধরে আঁকা ‘ত্রিভুজ’ টার কথা ভাবি ( উপরের ছবিতে NL’AQBLN‘ ত্রিভুজ’টা, যার শীর্ষবিন্দু তিনটে হল N,A,B বিন্দুগুলো )। খেয়াল রাখতে হবে এইরকম  ‘ত্রিভুজ’-এর বাহুরা কিন্তু ‘সরলরেখা’ হতে হবে, অর্থাৎ জিওডেসিক হতে হবে… আর সেইজন্যে, সাধারণ অর্থে ত্রিভুজ বলতেই আমরা যা ভাবি  তার থেকে আলাদা করার জন্য এইরকম ত্রিভুজকে ‘জিওডেসীয় ত্রিভুজ’ (geodesic triangle) বলা হয়। তা সে যাই হোক, মোদ্দা বিষয়টা হল উত্তরমেরু আর নিরক্ষরেখার ওপরে যেকোন দুটো আলাদা বিন্দু দিয়ে আঁকা ত্রিভুজটার ভূমি নিরক্ষরেখার অংশ, আর অন্য দুটো বাহু দুটো দ্রাঘিমারেখার অংশ, এবার যেহেতু দুটো দ্রাঘিমারেখাই নিরক্ষরেখাকে লম্বভাবে ছেদ করেছে, ভূমির উপরে তৈরি হওয়া কোণদুটোর যোগফলই দুই সমকোণ অর্থাৎ একশ আশি ডিগ্রী । তাই উত্তরমেরুর শীর্ষকোণটার মান যাই হোক না কেন, এই ত্রিভুজটার তিনটে কোণের যোগফল দুই সমকোণের চেয়ে বেশী হতে বাধ্য।  আমরা এই বিশেষ ত্রিভুজটা নিয়েছিলাম অবশ্যই নেহাত বোঝার সুবিধের জন্য, এই জ্যামিতিতে যেকোন ত্রিভুজের জন্যই এটা সত্যি। আরও একটা জিনিস খেয়াল করার, যে এই জ্যামিতিতে  যেহেতু ত্রিভুজের তিনটে কোণের যোগফল সবসময় দুই সমকোণের বেশী তাই এই জ্যামিতি অধিবৃত্তীয় নয়, উপবৃত্তীয় ।

গোলকের উপরের জ্যামিতি উপবৃত্তীয় জ্যামিতির উদাহরণ – এখানে ত্রিভুজের তিনটি কোণের সমষ্টি দুই সমকোণের বেশী!

উপবৃত্তীয় ও অধিবৃত্তীয় জ্যামিতি

গোলকের উপরের জ্যামিতি যে উপবৃত্তীয় সেটা  আমরা আরও একভাবে দেখতে পারি। সমান্তরাল সরলরেখায় ফিরে এসে। ধরা যাক, আমাদের একটা সরলরেখা হল নিরক্ষরেখা। নিরক্ষরেখার ওপরে নয় এরকম আর একটা বিন্দু নিলাম। এই বিন্দু দিয়ে নিরক্ষরেখার সমান্তরাল করে কটা সরলরেখা আঁকা যাবে? একটাও না। কারণ অন্য বিন্দুটি দিয়ে যাওয়া যেকোনো সরলরেখাই যেহেতু আর একটা মহাবৃত্ত, সেটা নিরক্ষরেখাটাকে দুটো বিন্দুতে ছেদ করবেই, তাই অন্য কোন সরলরেখাই নিরক্ষরেখার সমান্তরাল হবে না।

এই জ্যামিতিটা থেকেও উপবৃত্তীয় জ্যামিতি নামটারও কারণ বোঝা যাবে, কারণ বৃত্ত যেমন একটা বিশেষ ধরণের উপবৃত্ত (ellipse) , তেমনি গোলকও একটা বিশেষ ধরণের উপবৃত্তক ( ellipsoid, একটা উপবৃত্তাকার পাতকে তার কোন একটা অক্ষ বরাবর ঘুরপাক খাওয়ালে যে ঘনবস্তুটা পাব সেইটা।

imageellipsoid

এইভাবে পাতের মত জিনিসকে ঘুরপাক খাইয়ে তৈরি করা যায় এরকম জিনিসগুলোকে volume of revolution বলে, তাই উপবৃত্তক উপবৃত্ত থেকে যে volume of revolution টা পাওয়া যায় সেইটা )। ঠিক তেমনি একটা অধিবৃত্তকের ( hyperboloid, একটা অধিবৃত্তাকার পাতকে তার অক্ষ বরাবর ঘোরালে যে ঘনবস্তুটা পাব। অধিবৃত্তকের উপরিতলটা অনেকটা বেতের মোড়ার গা টার মত দেখতে ) উপরিতলের জ্যামিতিটা অধিবৃত্তীয় জ্যামিতি।

imagehyperboloid

ওইরকম জ্যামিতিতে আবার স্থান মোটেই বদ্ধ নয়, কারণ অধিবৃত্ত অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই এরকম তলের উপরের জিওডেসিকরাও অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত অধিবৃত্ত।  জিওডেসিক ত্রিভুজের তিনটে কোণের যোগফলও সর্বদা দুই সমকোণের কম।

 

তাহলে এ পর্যন্ত আমরা দেখলাম যে ইউক্লিডের পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধ ( এখানে দেখুন) আসলে বাস্তবিকই একটা স্বতঃসিদ্ধ আর সেটা কি বলে সেটাও খানিকটা ধারণা পেলাম। কিন্তু তার সাথে সাথেই উঠে এল নতুন প্রশ্নও। পর্ব দুই এ আমরা দেখেছিলাম যে ইউক্লিডীয় জ্যামিতির বীজগাণিতিকরণ, দেখেছিলাম ইউক্লিডীয় স্থান আর ইউক্লিডীয় ইনার প্রোডাক্টটা দেওয়া থাকলেই ইউক্লিডীয় জ্যামিতি নেহাতই বীজগণিতের হিসেব কষা মাত্র। এই বাঁকা স্থানেও কি সেরকম কিছু করা সম্ভব?

এই প্রশ্নটারই উত্তর দিয়েছিলেন রীমান, দেখিয়েছিলেন সম্ভব। তার এই বৈপ্লবিক কাজের সম্মানে আজকের জ্যামিতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগকে আমরা বলি রীমানীয় জ্যামিতি ( Riemannian geometry ) আর তার পরের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বিভাগটার নাম আধা-রীমানীয় জ্যামিতি ( semi-Riemannian বা pseudo-Riemannian geometry )।

রীমানের উত্তরটা বুঝতে আমাদের একটু সময় লাগবে, তাই আমরা আসতে আসতে এগোব।

ইউক্লিডীয় দূরত্ব-অপেক্ষক

প্রথমে আমরা ফেরত যাব ইউক্লিডীয় স্থানাঙ্ক জ্যামিতিতেই। পর্ব দুইতে ( এখানে দেখুন ) ইউক্লিডীয় দূরত্ব-অপেক্ষকের তিনটে ধর্ম  বলেছিলাম। ধর্ম তিনটে হল:

(1) d(a,b)≥0, একমাত্র যদি a=b হয়, তাহলেই d(a,b)=0

(2) d(a,b)=d(b,a)

(3) d(a,c)≤d(a,b)+d(b,c)

বস্তুত রীমান যতদিনে জ্যামিতির কাজ করছেন, ততদিনে অঙ্কের অন্যান্য বিভাগেও আমাদের জানা-বোঝা খানিক এগিয়েছিল। তাই থেকে ততদিনে এইটা বোঝা গিয়েছিল যে এই  ধর্ম তিনটে থাকলে যেকোন এরকম অপেক্ষকই দূরত্ব-অপেক্ষকের কাজ করতে পারে।

আরও একটা জিনিস খেয়াল করার যে  ইউক্লিডীয় দূরত্ব-অপেক্ষকের সূত্রটি হল:

(d(a,b))2=(a1-b1)2+(a2-b2)2+…+(an-bn)2

এখানে a1,a2,…,an  এইগুলো হল a বিন্দুটার স্থানাঙ্ক আর b1,b2,…,bn  হল b বিন্দুটার স্থানাঙ্ক। বলে রাখা ভালো, দূরত্ব-অপেক্ষকের এই সূত্রটি হল homogeneous quadratic polynomial বা সমসত্ত্ব দ্বিঘাত পলিনমিয়ালের একটি উদাহরণ।  এইধরনের homogeneous কোয়াড্রাটিক পলিনমিয়াল অবশ্য আরো অনেকরকমের হতে পারে। তাই গণিতজ্ঞরা এই ধরনের পলিনমিয়ালকে সাধারণত নীচের সাধারণ আকারে লিখে থাকেন।

f(x) =f( x1,…,xn) = ∑n(i,j=1) gij xxj,

যেখানে এই gij গুলো যেকোন বাস্তব সংখ্যা হতে পারে, আর x1, x2,…,xহল x বিন্দুর স্থানাঙ্ক।  এইবারে দূরত্ব-অপেক্ষকের সাধারণ ফর্মুলা a-bভেক্টরের সমসত্ত্ব দ্বিঘাত পলিনমিয়াল, তাই সেটার সাধারণ চেহারা হবে,

(d(a,b))2= ∑n(i,j=1)  gij (ai-bi)(aj-bj)

যেমন, ইউক্লিডীয় দূরত্ব-অপেক্ষকের ফর্মুলাতে, যদি i আর j আলাদা হয়, মানে ধরুন যদি i = ১ আর j = ২ হয়,  তাহলে আর যদি i আর j সমান হয়, মানে ধরুন যদি i = ১ আর j = ১ হয়, তাহলে gii=

এই ফর্মুলাটাকেই ম্যাট্রিক্স বা সারণী ব্যবহার করে আরও একভাবে লেখা যায়:

(d(a,b))2 =xTG x। এখানে G হল gij দিয়ে গড়া একটা n x n ম্যাট্রিক্স, মানে এই ম্যাট্রিক্সটার i-তম row আর j-তম column এ রয়েছে gij।  আর x হল (ai – bi ) দিয়ে গড়া একটা column বা স্তম্ভ ম্যাট্রিক্স, অর্থাৎ x এর i-তম row তে আছে xi= ai–bi ।  এখানে মানে এর ট্রান্সপোজ, অর্থাৎ কে স্তম্ভের আকারে না লিখে সারির আকারে লিখলে যা হবে, মানে row matrix আকারে লিখলে, আর পাশাপাশি চিহ্নগুলো লেখার মানে ম্যাট্রিক্সগুলোকে গুণ করা হয়েছে, ম্যাট্রিক্সের গুণ। গুণটা করে ফেলে ফর্মুলায় লিখলে দাঁড়াবে,

xTG x= ∑n(i,j=1)  gij xi xj

ট্রান্সপোজ যে অবশ্য শুধু সারি ভেক্টর বা স্তম্ভ ভেক্টরেরই করা যায় এমন নয়, যেকোন ম্যাট্রিক্সেরই করা যায়, সারিগুলোকে স্তম্ভ করে দিলেই (  আর তার মানেই স্তম্ভগুলো সারি হয়ে যাবে ) যে নতুন সারণীটা পাব সেটাই আগের ম্যাট্রিক্সটার ট্রান্সপোজ ম্যাট্রিক্স।

যেহেতু দূরত্ব-অপেক্ষককে উপরের তিনটে ধর্ম মেনে চলতে হয়, তাই  gij গুলো যা ইচ্ছে তাই হতে পারে না। আর সেই জন্য G ম্যাট্রিক্সটাকেও বেশ কয়েকটা ধর্ম মেনে চলতে হয়।   

প্রথম ধর্মটার জন্য G  ম্যাট্রিক্সটাকে  পজিটিভ-ডেফিনিট হতে হবে, অর্থাৎ xTG x≥0 হতে হবে, আরএকমাত্র তখনই হবে যখন , অর্থাৎ ai = bi হবে।

দ্বিতীয় ধর্মটার জন্য সবসময়  gij=gji হতে হবে। তাই G এর  i-তম row আর j-তম column এ যে সংখ্যা আছে তার মান আর  j-তম row আর i-তম column এ যে সংখ্যা আছে তার মান একই হতে হবে। এই ধরনের  ম্যাট্রিক্সটাকে সিমেট্রিক( symmetric ) ম্যাট্রিক্স বলে। শর্তটা থেকেই এমন নামেরও কারণ বোঝা যাচ্ছে। এরকম ম্যাট্রিক্সের বাঁদিকের উপর থেকে ডানদিকের নিচের কোণা অবধি কর্ণটাকে একটা আয়নার মত ভাবলে কর্ণের টার্মগুলো বাদে অন্য টার্মগুলো প্রত্যেকটা তার দর্পণ-প্রতিবিম্বটার সাথে সমান।  যেমন ইউক্লিডীয় দূরত্ব-অপেক্ষকের ক্ষেত্রে এই G ম্যাট্রিক্সটা দেখতে হবে এইরকম –

Screenshot from 2016-03-27 13_10_46

মানে শুধু কর্ণটায় ১ আছে, বাকি সব জায়গায় ০।

এইটা সিমেট্রিক। আবার ২x২ সিমেট্রিক ম্যাট্রিক্স এর উদাহরণ হিসেবে ভাবা যেতে পারে

ম্যাট্রিক্সটার কথা ।

তৃতীয় ধর্মটার জন্য অবশ্য কিছুই চাই না, কারণ আমরা এখনো অবধি যা যা ধরে নিয়েছি তার থেকেই ওই ধর্মটা ফাউ হিসেবে পাওনা।

একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে যে পর্ব দুই এর ইউক্লিডীয় দূরত্ব-অপেক্ষকের উদাহরণটার মতই এক্ষেত্রেও এই দূরত্ব-অপেক্ষকটা আসছে একটা ইনার প্রোডাক্ট থেকেই। ইনার প্রোডাক্টটা কেমন দেখতে? বস্তুত এক্ষেত্রে x ও y, দুটো ভেক্টরের ইনার প্রোডাক্ট আসলে Gx ও y এর ইউক্লিডীয় ইনার প্রোডাক্ট। যেহেতু G সিমেট্রিক, তাই x ও Gy এর ইউক্লিডীয় ইনার প্রোডাক্ট ও তাইই। ফর্মুলায় লিখলে দাঁড়াবে,

<x,y>=∑n(i,j=1)  gij xi yj

আচ্ছা, এইবারে যদি আমরা প্রশ্নও করি যে যদি আমরা ইউক্লিডীয় স্থানের ওপরে এইরকম কোন একটা ইনার প্রোডাক্ট ব্যবহার করে ( ইউক্লিডীয় ইনার প্রোডাক্ট টা নয় ) পর্ব দুই এর মত বীজগাণিতিক হিসেবগুলো করতাম তাহলে যে জ্যামিতি পেতাম সেটা কিরকম জ্যামিতি? সেটা কি আমাদের কোন একটা অনিউক্লিডীয় জ্যামিতি দিত? উত্তরটা হল, দিত না আসলে । কেন দিত না সেটা পুরোপুরি বুঝতে হলে অনেক অঙ্কের কচকচিতে ঢুকতে হবে। সেদিকে আমরা যাব না, কিন্তু ধারণাগত জায়গা থেকে বোঝা যাবে খানিকটা। ওইরকম হিসেব নিকেশ করলে আমরা যা পেতাম সেটা আসলে ইউক্লিডীয় জ্যামিতিই, আর হিসেব নিকেশগুলো ও খুব অপরিচিত কিছু নয়। বস্তুত ওই হিসেবগুলো আসলে হেলানো অক্ষের কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক জ্যামিতি ( oblique axes Cartesian co-ordinate geometry ) মাত্র। মানে সাধারণ কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক জ্যামিতিই, শুধু অক্ষগুলো পরস্পরের ওপর লম্ব, এইটা ধরা হয়নি।

তাহলে অনিউক্লিডীয় জ্যামিতি কিভাবে পাব?

অনিউক্লিডীয় জ্যামিতি কিভাবে পাব? – সেইটার উত্তর বুঝতে প্রথমে আমাদের আগে ভাবতে হবে যে বাঁকা জিনিসের ওপরে জ্যামিতিটা করব কিভাবে? আমরা আগেই দেখলাম যে অনিউক্লিডীয় জ্যামিতিগুলো আসলে বাঁকা স্থানের জ্যামিতি, যেমন গোলকের উপরিতলটা বাঁকা, অথচ আমরা যা হিসেবনিকেশ করতে শিখেছি, এই ইনার প্রোডাক্ট আর দুরত্ব-অপেক্ষক দিয়ে,  সেগুলো ইউক্লিডীয় স্থানেই কাজ করে। আসলে কেন ইউক্লিডীয় স্থানেই কাজ করে শুধু সেগুলো? সেটা খুব যে জরুরী আমরা যেটা বুঝতে চাইছি তার জন্য তা অবশ্য নয়, কিন্তু জিনিসটা মজার, তাই সেটাও আমরা একটুখানি দেখে নেব। আসলে ইনার প্রোডাক্ট নেওয়া যায় দুটো ভেক্টরের। ভেক্টর কাকে বলে? পদার্থবিদ্যায় ভেক্টর কাকে বলে আমরা জানি, কিন্তু অঙ্কে? অঙ্কে আসলে ভেক্টর বলতে শুধুই পদার্থবিদ্যার ভেক্টর বোঝায় এমন নয়। অঙ্কে ভেক্টর বলতে বোঝায় এরকম যেকোনো কিছুকেই, যার পদার্থবিদ্যার ভেক্টরের মত কিছু ধর্ম আছে। কোনগুলো?

আমরা পদার্থবিদ্যায় পড়েছি দুটো ভেক্টরকে যোগ করা যায়, করে যোগফল হয় তৃতীয় আর একটা ভেক্টর। সেখানে আমরা এটা করি সামান্তরিক সূত্র দিয়ে। আবার একটা ভেক্টরের সাথে একটা স্কেলার, মানে এক্ষেত্রে বাস্তব সংখ্যা দিয়ে গুণও করা যায়।  অঙ্কে তাই যেকোনো সেট, যার যেকোনো দুই সদস্যকে ‘যোগ’ করে তৃতীয় একটা সদস্য কে পাওয়া যায় আর যাদের যেকোনো সদস্যকে একটা বাস্তব সংখ্যা দিয়ে গুণ করে দ্বিতীয় আর এক সদস্যকে পাওয়া যায়, সেরকম সেটগুলোকে বাস্তব ভেক্টর স্থান  বা বাস্তব লিনিয়ার স্থান ( real vector space or real linear space) বলে। বস্তুত, ইউক্লিডীয় স্থানের প্রতিটি বিন্দুর অবস্থান সদিশ অর্থাৎ পজিশন ভেক্টর ( position vector) গুলোর সেট তা একটা বাস্তব লিনিয়ার স্থান। একটা ইনার প্রোডাক্ট আসলে একটা বাস্তব লিনিয়ার স্থানের ওপর একটা  অপেক্ষক, যার মান একটা বাস্তব সংখ্যা, আর সেই মান দুটো ভেক্টরের উপর এমনভাবে নির্ভর করে যাতে যেকোনো একটা ভেক্টরকে একটা বাস্তব সংখ্যা দিয়ে গুণ করলে ইনার প্রোডাক্টের মানটাও সেই সংখ্যা দিয়ে গুণ হয়।    ইনার প্রোডাক্ট সমেত একটা বাস্তব লিনিয়ার স্থান কে অঙ্কে  বাস্তব ইনার প্রোডাক্ট স্থান (real inner product space ) বলে।

তাহলে এখন প্রশ্ন বাঁকা জিনিসের ওপর জ্যামিতি করতে আমরা লিনিয়ার স্পেস কোথায় পাব? উত্তরটা খুব সহজ আসলে, আর সেইজন্যেই বহুদিন লেগেছে এটা বুঝতে। কথাটা ভারী গোলমেলে শোনালেও অঙ্কে সুদূরপ্রসারী ভাবনাগুলো আসলে সবসময়েই ভীষণ সহজ। কঠিন, ধাঁধালো জিনিসের মধ্যে আরো বিদঘুটে কিছু নাম, খটমট কিছু সংজ্ঞা এইসব দিয়ে আসলে তাদের মধ্যেকার ভীষণ সহজ সরল সম্পর্কগুলোকে সামনে আনাই অঙ্কের কাজ, সেইটাই অঙ্কের মজা, তার সৌন্দর্য।

(পরের  পর্বে সমাপ্য)

(প্রচ্ছদের ছবির উৎস)

[১] আর একটা বিষয় —  সাধারণভাবে সবসময়েই  সরাসরি যাওয়া পথটাই ছোট হবে, ঘুরে আসা পথটার থেকে, কিন্তু এর একটা ব্যতিক্রম আছে, বিন্দু দুটো পরস্পর বিপ্রতীপ ( antipodal ) হলে , মানে একটা বিন্দু থেকে শুরু করে গোলকটা ভেদ করে গোলকের কেন্দ্র দিয়ে  যাওয়া সরলরেখাটা ( সাধারণ অর্থে সরলরেখা )  গোলকের উপরিতলকে উলটোদিকে যে বিন্দুতে ছেদ করে সেইটাই যদি দ্বিতীয় বিন্দুটা হয়, যেমন Aআর A’ এর ক্ষেত্রে, তখন আর একমাত্র তখনই দুটো পথের দৈর্ঘ্য সমান, দুটো বিন্দু তখন নিরক্ষীয়  বৃত্তকে সমান দুভাগে ভাগ করেছে, পথদুটো সেই অর্ধবৃত্ত দুটো (ছবিতে AM’A’ আর AQBMA’)। এতে সমস্যা কিছু নেই, কারণ আমরা এখুনি দেখব যে ‘সরলরেখা’টা  একটাই, যে পথটাকেই সরলরেখাংশ  ধরা হোক না কেন

[২] প্রসঙ্গত, কিছু জায়গায় ‘সরলরেখা’ র ‘সংজ্ঞা’য় ‘অসীম পর্যন্ত বর্ধিত’ ই লেখা হয়, সেটা নিছক ভুল। infinitely extended আর extended upto infinity দুটোর অর্থে যে পার্থক্য হতে  পারে এখানের আলোচনা তার একটা ভাল উদাহরণ। বস্তুত ‘অনির্দিষ্টভাবে  বর্ধিত করলে’ ( extended indefinitely )  লেখাটাই সবচেয়ে নিরাপদ, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ইউক্লিড এ অসীম শব্দটি রয়েছে।

 

লেখক পরিচিতিঃ স্বর্ণেন্দু শীল ইকোল পলিটেকনিক ফেডেরাল দে লসান-এ ডিফারেনশিয়াল ইক্যুয়েশন নিয়ে গবেষণা করে। এর আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জীনিয়ারিং এবং টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (ব্যাঙ্গালোর) থেকে অঙ্ক নিয়ে পড়াশুনো করেছে।

 

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: