#১

টিউশন বস্তুটা আমার সাথে লেপ্টে গেল আমার ক্লাস সিক্স থেকে। আমার বেশির ভাগ সহযোদ্ধাদের থেকে কিছুটা দেরিতেই। কিন্তু আমার বাবা কিঞ্চিৎ সেকেলে বলে টিউশন এড়াচ্ছিল। বোধহয় নিজের একখানি তিক্ত অভিজ্ঞতাও একটা কারণ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দিতে পা গলিয়ে মাধ্যমিকের গুরুত্বকে অস্বীকার করে, বোর্ড-সিলেবাসীয় প্যানিক উপেক্ষা করে সন্তান মানুষ করবে, এই ধক মানুষের ছিল না। আমার বাবারও না। মায়ের তো না-ই। অতএব অনেক খোঁজ-খবর-ঝাড়াই-বাছাইয়ের পর ধ-দিদিমণি নিয়োজিত হলেন।

বেশ ভাল ছিল, অল্প বকত , কিন্তু আমার বাড়ির টীচারদের মধ্যে ওই বেস্ট! তার বছর দুই পর আবার একটা টিউটোরিয়াল। সেখানে দেদার বন্ধু ছিল, নিজের স্কুলের, অন্য স্কুলের … তারপরেই বাড়িতে একজন স্যার। এই প্রাণীটিকে নিয়ে কথা খরচ করা যেতেই পারে, কারণ আমার অতগুলো অভিজ্ঞতাকে একফুয়ে উড়িয়ে দিতে পারে ওই লোক।

আমি তখন ক্লাস এইট ছেড়ে নাইনে ঢুকব-ঢুকব করছি। ভাইটাও ফোর থেকে ফাইভে উঠবে। বাবা ভাবল এক ঢিলে যদি দুই পাখি ম্যানেজ হয়। শ–বাবু এলেন। সেকি মারাত্মক সিভি তার! রামকৃষ্ণ মিশন পুরুলিয়া। রাজবাজার সাইন্স কলেজ। চলমান ব্রহ্মচারী। খুউউউব কড়া। মনে হল শাকাহারী হবে নির্ঘাত। যদিও বিএসসি পড়ে, দেখে মনে হয় একটা প্রাচীন বটগাছের ঝুড়ি (গাছটা নয় : খুব রোগা তো) ভাইটা ওর কাছে একদিন পড়েই দেখলাম ১০ বছর বয়েস বাড়িয়ে ফেলেছে! নেক্সট দিন আমার টার্ন। সকল থেকেই গলা শুকিয়ে আসছে। বারেবারে থুতু গিলছি। ভাই বলেছে ও হাসেও না, হাসায়ও না। কী ভয়ঙ্কর! তারপর তো এল সেই মুহূর্ত। কলিং-বেল বাজল। ব্যাক্তি এলেন, বসলেন। বই চাইলেন। কী ভয়াবহ প্রেজেন্স লোকটার! কোনও হাসি নেই, বাড়তি কথা নেই। তরপরেই হঠাত্ইয নিজের ব্যাগ থেকে একখান খাতা বের করে বলল “নোট নাও”। নিলাম। খাতাটা এক ঝলক দেখে নিল। তারপর বলল “মোটা বাঁধানো হার্ড-কভার খাতা কিনবে!” ভয়ে ভয়ে ঘাড় নাড়লুম। ইতিমধ্যে পাশে বারান্দা দিয়ে ভাই মনে হল বাথরুমের দিকে গেল। ওকে ঠিক মুক্ত বিহঙ্গ মনে হল। হ্যাঁ অতটা কাব্যিক ভাবেই মনে হল। দূরে কোথাও একটা গান চলছে। হামরাজের টাইটল ট্র্যাক। ভাই বারান্দা দিয়ে ফিরছে, আর মনে মনে বেখেয়ালে গানটা গুনগুন করছে। হঠাত্‍ লোকটা হুংকার দিয়ে উঠল। “এদিকে এস!” ভাই চমকে উঠে ঘরে ঢুকে পড়ল। আমার একটু হাসিই পেল। কিন্তু লোকটার মুখের দিকে তাকিয়েই হাসি শুকিয়ে গেল। ভাই বেচারা মুখ করে দাঁড়িয়ে।

“তুমি হিন্দী গান গাও?” আমার আবার হাসি পেল। ভাই কী বলবে বুঝতে পারল না। “উত্তর নেই যে? বাবা মায়ের সামনে তুমি হিন্দী গান গাও? লজ্জা করে না? বাড়িতে কিছু বলে না?”

“তুমি এক্ষুনি হিন্দী গান গাইছিলে না?” আমার আবার হাসি পেল। কিন্তু অভ্যেস হয়ে আসছে। চাপতে পারছি। ভাই তো অবাক। বলল না। ও নিজেও বোধহয় খেয়াল করেনি গুনগুন করছিল। “আবার মিথ্যে কথা!” আমি, ভাই, দুজনেই হতবাক এবং চুপ। আবার প্রশ্ন। এবার আমায়। ”ও গান করছিল না?” ঘটনাটা সত্যি। মিথ্যে বললে কী করবে, বলা যায় না। সম্মতিসূচক মাথা নাড়লুম। তবে? এবার আবার ভাইকে। আমি খুব কষ্টে ওর দিকে তাকালাম। ও অবাক আর অভিমান মিশিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। “কী? উত্তর দাও?”

“কিসের?” ভাইয়ের সাথে আমিও হতভম্ব।

“কিসের?! এই যে বাবা মায়ের সামনে গান হিন্দী গাও ওনারা কিছু বলেন না?” ঠাকুমার ঝুলি হলে লোকটার চোখ দুটো নির্ঘাত ভাঁটার মতন জ্বলত।

“মা তো নিজেও হিন্দী গান গায়। বাবাও গায়।”

লোকটা কী বলবে প্রথমে ভেবে পেল না। কিন্তু সে তো কয়েক মুহূর্ত। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে হুংকার পেরে বলে উঠল “এরপরও আবার মিথ্যে কথা! লজ্জা করে না? যাও এক্ষুনি পড়তে বসো! পরেরদিন তোমার ব্যাপারটা দেখছি আমি!”

#২

ভাই বেরিয়ে গেল। আমার সন্দেহ হল এই ট্রমা কাটিয়ে উঠে ওর পক্ষে আর কোনওদিন হিন্দী গান গাওয়া সম্ভব হবে না। আরেকদিকে মনের ভেতর সুনামিক প্রশ্ন যে হিন্দী গান গাইলে কী হয়। কিনতু এ যা জিনিস! একে জিজ্ঞেস করলে নির্ঘাত ব্রহ্মতেজে ঝলসে দেবে। আমি চুপচাপ ‘নোট’ নিতে লাগলাম আর আড়চোখে দেখতে লাগলাম। লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ইচ্ছে হল।

যখন প্রথমবার শুনেছিলাম এবার দিদিমণির পরিবর্তে স্যার, দেদার পুলক হয়েছিল। কে না জানে টিউশন স্যারেরা ভবিষ্যৎ প্রেমিক হয়। বাবার সাথে যেদিন কথা বলে গেল, উঁকি ঝুঁকিমেরেও বেশি কিছু দেখতে পেলুম না। কৌতুহলের মত জিনিস নিবৃত্ত না হলে যা হয়। উত্তেজনা আর কল্পনা পাল্লা দিতে লাগল। প্রথমে ভাইকে পড়াবে শুনে খুব খুশি হলুম। অবজ়ার্ভেশনের পক্ষে খুবই অনুকূল সংবাদ। লোকটা এল একটা তালপাতার সেপাই। ফটফটে ফরসা। একটু সন্দেহ হল রোগা হতে হতে সী-থ্রু হয়ে গেছে কিনা। তা হোক, মনকে বোঝালাম। দেখতে নিয়ে ভাবে শ্যালোরা। কিন্তু গোটা সেশনটায় পাশের ঘর থেকে যা চাপা গর্জন আসতে লাগল পুরো বাড়া-ভাতে ছাই।

নোট নিতে নিতে এসব সাতপাঁচ ভেবে যখন নিজের কপালের জন্যে কান্না জমে এসেছে আর পরম আদরে দুঃখটা পোহাচ্ছি, হঠাৎ লোকটা বলে উঠল “নিউটনের ফার্স্ট ল বল।” আমি এটা জানতাম। কিন্তু ওই মুহূর্তে কথা জড়িয়ে গেল। শোকে লোকে কথা হারিয়ে ফেলে না? জোড়াতাপ্পি দিয়ে কোনওমতে মোদ্দা কথাটা বললুম। লোকটা আবার ঠাকুমার্ঝুলিয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। চোরের মন তো সেই বোঁচকার দিকেই। আমার খুব চিন্তা হল। ও কী বুঝে ফেলেছে কী ভাবছিলাম? কী লজ্জা! এ যা লোক, মাকে বলবেই। মা হিন্দী গান গাইলেও এসব দুঃখের কোনও দাম দেবে না, আমি জানি।

লোকটা বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করল। “নিউটন এটা বলেছেন?” প্রথমে ফাঁড়া কেটেছে ভেবে খুব ফুর্তি হল। যাক। ওটা বোঝেনি। পরক্ষণেই আবার একটু চিন্তা হল। বলেনি বুঝি? আমি তো সত্যি নিউটনের মুখে শুনিনি, এটা তো ফ্যাক্ট। সত্যি বলতে কী বইটাও নিজে খুলে দেখিনি যে এর প্রতিবাদ করি। কিন্তু যদ্দূর মনে পড়ে বাবা এটাই বলেছিল যে জোর না করা হলে যে যা করছিল তাই করে যাবে। এমনকি গড়ান্ত বলের থামার জন্যেও মেঝেটাই দায়ী, বলটা নয়। বাবার ওপর রাগ হল। দেখে বলতে পারত। বাবার মনগড়া গল্প তখন এত বিশ্বাসযোগ্য লেগেছিল, এখন এই লোকটার সামনে বেইজ্জত করে দিল। আবার বলল “নিউটন এটা বলেছিলেন?”

খুব বিরক্ত লাগল। না বলে থাকলে কী বলেছিল তুইই বল। “আমি তো তাই শুনেছি।”

“তুমি শুনেছ?! নিউটন তোমার চায়ের দোকানের ইয়ার?!”

“না।” আমারও এবার আর ধৈর্য থাকছে না। “ভুল বলেছি?”

“নিউটন তোমার ইয়ার-দোস্ত নয়! ল বলতে হলে সেই ভাষাতেই বলতে হয় যা লেখক প্রথম লিখেছিল!”

এবার আমার আকাশ থেকে পড়ার পালা। লোকটা বলে কী? আমি জিকেতে পড়েছি নিউটন ল্যাটিনে বই লিখেছে। নামটা পর্যন্ত জানতে হয়েছিল। ইয়ার্কি? “ল্যাটিনে বলতে হবে?!”

লোকটা থমকাল। তারপর রাক্ষুসে মুখ বানিয়ে, দাঁত খিঁচিয়ে উঠে বলল, “এত বেশি কথা তোমার?! এত পাকামি শিখছ?এত সাহস … টিচারকে সম্মান করতে শেখোনি? অশিক্ষিত বেয়াদপি কোথ্থেকে শিখছ? …” সে আর থামে না।

লজ্জায়, রাগে, কান গরম হয়ে উঠছিল, তবু দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছিলাম। কিন্তু যেই না বলল “শুধু বাড়ির বৌ হয়ে ভাতের থালা এগিয়ে দেবার শখ থাকলে পড়াশোনাটা ছেড়ে দাও” কী যে ভেতরে হল বোঝাতে পারব না। শুধুই মেয়েলি অপমান বলে, নাকি এত বাচ্চা একটা লোক এরকম অসম্ভব জ্যাঠা ভাষণ দিল বলে, নাকি আমার এত অসম্ভব খারাপ স্যার-ভাগ্য বলে, নাকি এই সবগুলো একসাথে হল বলে, জানি না, কিন্তু আমি ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলাম।

#৩

এই বয়সে এসে অনেকগুলো টিউশন করিয়ে ফেলে নিজেকে আবার লোকটার জায়গায় কল্পনা করলাম। প্রতিবারের মত এবারও কুঁকড়ে গেলাম। আমার কারণে আমারই স্টুডেন্ট আমারই সামনে বসে কেঁদে দিলে আমি সম্ভবতঃ তক্ষুনি পালাব। আর কোনওদিন যে সে বাড়িতে পা রাখব না বলাই বাহুল্য। কিন্তু সবাই তো আমি নয়, এ তো নয়ই। দিব্যি বসে আমার কান্নার ওপর দিয়েই নোট দিয়ে যেতে লাগল, আর অবাক কান্ড, আমিও মিস করার ভয়ে লিখতেও লাগলাম! অতি অবশ্যই লেখানো হল নিউটনের ফার্স্ট ল। “Everyobjectcontinuestobeinastateofrestorofuniformmotioninastraightlineunlesscompelledbysomeexternalforcetoactotherwise”! লোকটা নিজেও এভাবেই বলত আর আমাকেও বলেছিল এটাই করতে। তারপর চলে গেল। পরের দিন পড়া ধরবে।

লোকটা যে বিচ্ছিরি এ বিষয়ে আমি নিঃসংশয়। এখন প্রশ্ন একে আর কতদিন সহ্য করতে হবে। আবার শনিবার এল, আমার পড়ার দিন। বই-খাতা এনে বসতেই মনে হত বন্দী হয়ে গেলাম। প্রথমেই বলল “নিউটনের ফার্স্ট ল বল।” কোনও মনে হয়? বললাম।

“হয়নি।“

আমি তো অবাক। হয়নি মানে? আবার বললাম।

“হয়নি। শোনো, তুমি যদি ভেবে থাকো যা খুশি বলে পার পেয়ে যাবে, সেটা হবে না। আমার ধৈর্যের অভাব নেই।”

“আমার মনে হয় আমি ঠিকই বলেছি।”

“তাই? এবার আমি বলি?”

এসব কথায় কী বলতে হয় জানি না, চুপ করে রইলুম। লোকটাও তাকিয়ে আছে। একটু ভয়ই হল। মাকে ডাকবে নাকি? আবার বলল, “বল আমি বলব কিনা?”

“হ্যাঁ।” আমি নতমস্তক।

“Everyobjectcontinuestobeinastateofrestorofuniformmotioninastraightlineunlesscompelledbysomeexternalforcetoactotherwise, তুমি কী ভুল বলেছ বুঝতে পেরেছো?”

আমি চুপ।

“বুঝতে পেরেছো????????”

“না।”

“না?! এরপরেও না? ইউনিফর্ম বলেছিলে?”

“না।”

“… ইন আ স্ট্রেট লাইন বলেছিলে?”

“না।”

“এটা নিউটনের ল?”

আমি চুপ।

“এটা নিউটনের ল???”

“না।”

“তোমার মাকে ডাকো।”

মনে হল ভুল শুনলাম। থাকলাম সাহস করে। আবার বলল “মাকে ডাকো!”

প্রাণটা হাতে করে উঠে গেলাম। মা এল। মাইরি বলছি, ইনিয়ে বিনিয়ে বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মত সবটা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিল। কী পিটপিটে লোক! বাকিটা তো জানা কথাই। মা বকতে লাগল, ও মজা পেয়ে গেল মাকে দলে পেয়ে আর আমার ঢ্যাঁটামি বাড়তে লাগল।

এরকম একদিন অঙ্ক করছি আর লোকটা চেয়ারে হেলান দিয়ে পড়ে আছে, আর মনে মনে ভাবছি এক্ষুনি মরে যাক। সবে একটা শেষ করে, বইয়ের সাথে উত্তরটা মিলিয়ে পরেরটায় যাব, খাতাটা চাইল। জেগেছিল, বুঝতেই পারিনি। দিলাম। খুব নাটুকে ভাবে চোখ বন্ধ করে বলল, “কী বুঝতে হবে আমায় এর থেকে?”

লোকটার প্রশ্ন বোঝার আর আজকাল চেষ্টা করি না। বললাম, “অঙ্ক।” লোকটা চোখ খুলে সোজা তাকিয়ে রইল। হঠাৎ টেবিলের ওপর হামলে পড়ল। আমি ভাবলাম মারবে, নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে যাব, আমার পেছনের জানলাটার দিকে শীর্ণ, রক্তশূন্য একটা ভূতুড়ে আঙুল দেখিয়ে বলল, “ওই বাড়িটা দেখছ?” আশ্চর্য ছিঁচ্কে তো?! এভাবে কাগা-খায়-বগা-খায় করে ভুলিয়ে ভালিয়ে মারবে? আমায় ভাবেটা কী? না ঘুরেই বললাম, “ওটা সেনবাড়ি।”

“ওটা কিরকম ভাঙাচোরা দেখতে পাচ্ছ?” কী বিরক্তিকর! আমিও ঠিক করলাম কিছুতেই সুযোগ দেব না। বললাম, “জানি, ছোট থেকেই দেখছি।”

“তোমার অঙ্ক করাও ওরকম। ওই বাড়িটার যেমন কোনও বাঁধন নেই, তোমার অঙ্কের স্টেটমেন্টেরও কোনও বাঁধন নেই। ওইরকম দাঁত ছিরকুটে দেখতে। এভাবে আর কিছুই না, মাধ্যমিকে ফেল করে চায়ের দোকান দিতে হবে।” বলেই আবার ঝিমিয়ে গেল।

#৪

আমার বাড়িতে এমনিতেই টিউটরকে খাওয়ানোর চল আছে। তার ওপর নাকি সেএএএএএই রাজাবাজার থেকে সোজা আমাদের বাড়ি আসে। নিত্য মা টোস্ট-অমলেট-চা কিম্বা লুচি-তরকারি খাওয়াতে লাগল আর প্রবল আহা-উহু করতে থাকল। লোকটাই হিরো। আমি একটা বাজে অব্স্ট্যাকল। ইতিমধ্যে আমি নাইনে উঠে গেলাম আর আমার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও একে অ্যাডিশনাল পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হল।

ইতিমধ্যে ভাইয়ের কপাল খুলে গেল। শ-বাবুও বলল ওকে আর পড়াবে না (ও নাকি খুবই ছোট) আর ওর বন্ধুদের দেখাদেখি ওকে ওর স্কুলেরই এক খোঁয়াড়ে পুরে দেওয়া হল এবং প্রথমে অনেক আপত্তির পর ও অচিরেই বাড়ির বাইরে, গ্রুপে পড়ার ফুর্তি বুঝে ফেলল।

অতএব এখন দুদিনই আমি পড়ি, এবং দ্বিগুণ অপমানিত হই। আমি আমার মত অঙ্ক করলে তার বাঁধন থাকে না, ওর মত করলে ক্লাসটেস্ট শেষ করতে পারি না। আর যারা দেবীমিসের কাছে পড়েছে, জানে মিস একদম অঙ্কে বাজে কথা খরচ করেন না। এই যখন অবস্থা, আমার অ্যাডিশনাল ক্লাসটেস্ট ঘনিয়ে এল। আমার বাবা-মা হচ্ছে সেই জাতীয় লোকজন, যারা কাজ ডেলিগেট করেও শান্তি পায় না। রান্নার লোক রাখলেও মা রান্নাঘরে, টিউটর রেখেও বাবার জানা চাই কবে পরীক্ষা, কী সিলেবাস, সব কভার্ড কিনা। আমি কম্প্লেন করার এই লোভনীয় সুযোগ ছাড়তে পারলাম না। “স্যার এখনও অ্যাডিশনাল স্টার্ট করেনি।”

বাবার ভুরু কোঁচকাল। কাজ হচ্ছে! শ-বাবু তুমি মরলে এবার। “কেন?”

“সে আমি কী করে জানব?” জানতেও চাই না। জানাতেও চাই না। শুধু একদিন কেস খেতে দেখতে চাই।

“তুই বলেছিস কী চলছে অ্যাডিশনালে?”

এই রে! আমি কেন বলতে যাব? কোনমতে জোগালাম, “আমার ভয় করে।”

“মানে? এ আবার কী? তুই বলবি?! এই শনিবারই বলবি।”

যাঃ! “আচ্ছা।”

শনিবার খুউউউব হালকা করে বললাম। আর বললাম সোমবার টেস্ট। বলল শেষে দেখবে। যাক। অ্যাডিশনালে আমি এমনিতেও কিছু বুঝি না। তালেগোলে অ্যাডিশনাল কিন্তু করা হল না। আমার বিস্তর পুলক। এবারে আমি টেকনিকালি সেফ কিন্তু শ-বাবুর গোকুল ইজ় লুকিং গ্রেভ়! এই তো চাই।

হবি তো হ, শেষ সীনে ঘড়ি ধরে বাবার এন্ট্রি। “কী? কেমন চলছে? সোমবার তো পরীক্ষা।” বাবা স্মিতহাস্য। শ-বাবুর মুখটা দেখার মত। কিন্তু এতই সহজ? মুহূর্তে সামলে উঠে বলল, “দুদিনটা তিনটে সাব্জেক্টের পক্ষে কম হয়ে যাচ্ছে। অ্যাডিশনালের টাইমটা হয়ে উঠছে না। ওরও একটু অমনযোগী স্বভাব তো, সবটা চাইলেও আঁটাতে পারছি না।”

কী বজ্জাত, কী বজ্জাত! একঢিলে তাহলে ঠিক কটা পাখি হল?

#৫

দিন যায়। তিনদিন টাইম হবে না বলে ২ ঘন্টার বদলে ৩ ঘন্টা লোকটার ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে হয়। “কঠোর বিদ্যাভ্যাস” আয়ত্তের অজস্র “টোটকা” শুনি। কেমন লোকটার সাক্সেসফুল কেরিয়ারের পেছনে পাখাবিহীন চিলেকোঠায় বাইরে থেকে শেকল তুলে বন্দী থাকার অবদান সবচেয়ে বেশি। কেমন রামকৃষ্ণ মিশনের ঠেঙানির অবদান তার পরেই। ইতিমধ্যে আমার হাতের লেখা পাল্টে ওর মত করে ফেলতে হয়েছে (যেটা কিনা হুবহু এরিয়াল ফন্ট, নো কার্সিভ্ অ্যালাওড)। পরীক্ষা যে শেষ হয় না, বলাই বাহুল্য।

অ্যাডিশনাল কিন্তু আর হয় না। আমার যে তাতে আপত্তি তা নয়, কিন্তু একে তাড়ানোটা খুব দরকার। এদিকে আমি ওর ওই অসহ্য নোট আর নিতে পারছি না। মুখস্থ আমি পরীক্ষার চাপেই করতে পারি না, ও কে হরিদাস পাল যে আমি শুনতে যাব ওর কথা? এদিকে আমি মুখস্থ করি না বলে সেই অজুহাতে শাসন করতে বসে আর অ্যাডিশনালের সময় থাকে না। আবার একদিন খুব হুলিয়ে গন্ডগোল পাকাল। আর যাবার সময় বলে গেল, মুখস্থ হলে যেন ফোন করে জানাই, তবেই আবার আসবে নইলে না।

প্রথমে এত আনন্দ হল, বলার কথা না। ওকে উত্যক্ত করতে পারার ফুর্তিই আলাদা। কিন্তু ফোন? এরকম ফোন তো সবার সামনে করা যাবে না? আর মা তো থাকবেই। যদি দাদুর ঘর থেকেও লুকিয়ে করি, নম্বর তো জানি না। ওই হনুর নম্বর আমার পুষতে বয়েই গেছিল। এখন তো মার কাছেই চাইতে হবে! সে সময় অত ভাল মিথ্যে বলতে পারতাম না (এই এসব ব্যাদড়া টিচাররা এসেই মিথ্যের উপকারিতার প্রতি ক্রমশ জ্ঞানচক্ষু খুলে দিয়েছিল)। অতএব ডিনায়াল। আগে ওই দিনটা তো আসুক, ভাবব।

লোকটা এল না। মা একটু বিরক্ত হল। খাবার করে রেখেছিল। জানাতে পারত। আমি ঘাপটি মেরে আছি। ওরা আশা করছিল পরে অন্তত জানাবে, জানাল না। পরের দিনও এল না। জেদটা ভাবো! লোকে এরপর হিন্ট তুলে নেয় যে আর আসবে না। কিন্তু আমার কপাল আর কবে আর এত ভাল। বাবা ওর শরীর খারাপ কিনা ভেবে একদিন রাতে ফোন করে বসল।

“না না, আমার কিছু হয়নি। আমি তো ওকে বলেই এসেছিলাম যে পড়া তৈরি হলে তবেই যাব। ও বলেনি?”

#৬

ওই কথা শোনার পর মা যথেচ্ছ শাসন করল, বাবা প্রথমে নাক গলাল না (সম্ভবতঃ ওই শাসনটা ডিজার্ভ করি ভেবেছিল)। তারপর বাবা জানতে বসল ঠিক কী হয়েছিল। বললাম। ইতিমধ্যে বাবার সাথে লোকটার কথা হয়ে গেছে এবং আবার আসবে। আমি যেন পারতপক্ষে ভব্যতা বজায় রাখি সে বিষয়ে কিছু বলল-টলল, আমি বিশেষ কান দিইনি। কিন্তু কথা হল, সময় ভাগ করা হবে সব সাবজেক্ট-এর জন্যে, এবং মুখস্থ করা নিয়ে বেশি চাপ নিতে হবে না। কিন্তু লোকটা এখনও দূর হল না।

পরেরবার যখন এল, ততক্ষণে আমি আমার চোয়াল শক্ত করে রেডি, কথা না বলে যথাসম্ভব প্রকাশ করার চেষ্টা করছি যে আমি একটুও অনুতপ্ত নই। অ্যাডিশনাল করা হবে স্থির হল। খানিকটা হিজিবিজি করেই আবার কম্পাল্সারি ম্যাথ, না হলে ফিজিকাল সাইন্স। বেশ, এটা রিপোর্ট করতে হবে। আরও দিন খানেক এরকম গেল। প্যাটার্ন পেয়ে গেলাম। অ্যাডিশনাল করতে হলেই খুব আপত্তি থাকে লোকটার। এই সুযোগ তো ছাড়া যাবে না। অতি অবশ্যই ঘন ঘন আমার অ্যাডিশনাল পরীক্ষা থাকতে লাগল। ১০০-র বেশি-ই হবে। অ্যাডিশনাল করতে হলেই লোকটা এক্সট্রা ঝিমিয়ে থাকে। খুবই ভাল ব্যাপার। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে নিয়ে গেলাম যে আবার একদিন হঠাত্‍ এল না।

এবার বাড়ি সোজা আমাকেই জিজ্ঞেস করল কী করেছি (বা করে রাখিনি)। আমি ভালমানুষটি সেজে বললাম এরকম তো কিছু হয়ই নি। “সত্যি তো? আমি তাহলে ফোন করি?”

এত আনন্দ হল! “আমায় তো বিশ্বাস করবে না, কর।”

লোকটার ঝিমনোর কারণ (অজুহাত) জানা গেল। সে নাকি সিভিয়ার গ্যাসট্রিকের রুগী। সে কলেজ আর টিউশন করিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ওর মা নাকি পড়াতে বারণ করেছে। অন্যের কষ্টে এত খুশি আগে আমি কখনও হইনি। কিন্তু আমার মা তো গলে গেল। বলল একদম চিন্তা করতে না, দরকার হলে ওর মার সাথে কথা বলে বুঝিয়ে দেবে যে যত্নে কোনও ত্রুটিই হবে না। তাতে লোকটা ভয়ানক গলে, কৃতার্থ হয়ে বলল তার নাকি দরকার হবে না, ও আসবে।

এবার আর অমলেট টোস্ট নয়, একেবারে ফলমূল দিয়ে কাস্টার্ড শুরু হল। আদিখ্যেতা দেখে গা জ্বলে গেল। গবগবিয়ে খেটেও লাগল দিব্যি আর মন দিয়ে ঝিমোতেও থাকল। আমার রোখ চেপে গেল। অ্যাডিশনালে তখন একটু একটু স্ট্যাটিস্টিক্স শুরু হয়েছে কিন্তু এ কিছুতেই ধার মাড়ায় না। প্রতিদিন শুধু ওই এক ফ্যাক্টরইজেশন চলছে।

একদিন বললাম স্ট্যাটিস্টিক্স পরীক্ষা। যা খুশি হয়ে বললাম, পরীক্ষা নিয়ে অত একসাইটেড বোধহয় কেউ জীবনে হয়নি। বাধ্য হয়েই করাতে বসল। ক্লাস লিমিট দেওয়া থাকলে ক্লাস বাউন্ডারি বের করে নিতে হয়, আর আমি সেটা জানিও। কিন্তু কী আশ্চর্য! এ জানে না! মিডপয়েন্টটাকে যে ভ্যারিয়েবল বানাতে হয়, সেটাও আমাকেই বলতে হচ্ছে। আমায় আর পায় কে! কেন এত আপত্তি অ্যাডিশনালে এবার বুঝলাম। ভাবলাম এবার একে তাড়ানো যাবেই। তারপর মনে হল, ঘুরিয়ে ঠিক আমার ঘাড় দিয়েই চালাবে, ভাল মত প্রুফ জমানো দরকার। তক্কে তক্কে থাকতে হবে। সেদিনকার মত একটাও ঝামেলা না করে কেটে পড়ল। কিন্তু আর এল না। নিজেই ফোন করে জানাল শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছে না।

যা খুশি হলাম, বলার নয়! কিন্তু কদিনই বা! বাবা আরেকটা শ-বাবু যোগাড় করল। তালব্য শ দিয়েই।

পুঃ – শেষ একে বাবা আর ভাই, ভাইকে ওদের স্কুলেরই একটা টীচারের টিউটরিয়ালে নিয়ে গিয়ে দেখেছিল গোল ভুঁড়ি নিয়ে ক্লাস নিচ্ছে। সেটা ২০০৮/০৯ হবে।

পুঃ পুঃ – লোকটা নিজেকে এস এন দের ছেলে বলেছিল। মাধ্যমিকে পড়তাম বলে তাত্‍পর্যটা বুঝিনি। এত আফসোস হয়! জানলে এত সহজে “ছাড়তাম” না!

লেখিকার ব্লগপাতাঃ http://jachchhe-tai.blogspot.com/

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: