কসমিক লোনলিনেস

ছেলেবেলায় একাকিত্ত্বকে খুব ভয় পেতাম। আমাদের দু কামরার ফ্ল্যাটে হইচই, হুল্লোড় লেগে থাকত সমস্ত দিন। ঘরে ফিরেই দেখতাম এক ঘর লোক। এক গাদা আনন্দ, অভিযোগ। পাড়ায় বেরোতেই বন্ধুদের ঝাঁক। খেলা ধুলা চলত বিকেল থেকে রাত।
এই যে এত হুল্লোড়, এত লোকের ভীড়, দিব্যি দিয়ে বলতে পারবনা যে সে সময়েও একলা হইনি।

বরং শৈশব থেকেই যেন জ্ঞান চক্ষু ফুটেছিল আমার। ক্রিকেট খেলা হত পিচের রাস্তায়। লম্বা ছিলাম তাই লং অনে ফিল্ডিং করতে পাঠাত দাদারা। বোলার যখন ধীর পায়ে ছুটতে শুরু করত, ব্যাটসম্যান যখন গার্ড নিত উইকেটের সামনে, হঠাৎ মনে হত, যেন চিরটাকালই একলা আছি। এই যে এত ঘষাঘষি, ঠাসাঠাসি, ক্যাচ ধরার পর অথবা ছক্কা মারার পর উত্তেজনা; মুহুর্তের উচ্ছাস-আবরণ প্রশমিত হলেই আবার সেই একাকিত্ত্বর পূর্ণ প্রকাশ। একটু বড়বেলায় বার্ট্রান্ড রাসেলের লেখায় একটা শব্দবন্ধ পেয়েছিলামঃ কসমিক লোনলিনেস।
কৈশোরে অথবা প্রাকযৌবনে যখন টের পেলাম এই জুয়াচুরিটা, তখন ভাবলাম হইচই দিয়েই ফাঁক ভরাট করা যাক। অন্তরে হয়ত সকলেই খুব একলা। তা বলে চলা ফেরার জীবনটাকে এমন হতে হবে কেন? অন্তত হুল্লোড় দিয়ে কিছুটা মন ভোলানোতো সম্ভব। ধারণা হয়েছিল, একাকিত্ত্ব বোধকরি একটা দুর্দান্ত রকমের খারাপ লোক। মন মগজ সাবাড় করে দেবে।
সময়ের সাথে সাথে পথ ঘাট ফাঁকা হয় যায়। ঘর ভর্তী মানুষজন কোথায় উধাও। যে পাড়ায় ছেলেমেয়েদের খেলার চোটে সন্ধ্যে আটটা অবধি কুরুক্ষেত্র হত সেই পাড়াও সময় পালটালে শান্ত হয়ে আসে। যে মোড়ে দাঁড়ালে অপর দিকে প্রেমিকাকে দিব্যি দেখা যেত, যে ঘরে ফিরলে মা থাকবেই হাজার টাকার গ্যারান্টি, সেই রাস্তা বা সে ঘর সময় পালটালেই নেই-শুন্য দেশ।
মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমার আঁতাতটা বোধহয় নিতান্ত গভির। নচেৎ যতই পালাই না কেন, সে ঠিক রিডাইরেক্ট হয়ে ফিরে চলে আসে। প্রথম বয়েসে বছর দেড়েক ছিলাম। একাকিত্ত্বর ফাঁকটা একদম জ্বলজ্বল করে সে জানিয়ে দিলে। ফাঁক ভরার জন্যেই আবার দেশে পালালাম। তার পর অর্থ রোজগারের ধান্দায় যখন এটা ওটা সেটা করছি, আমেরিকার খরিদ্দার এসে বলল, ‘আছে নাকি পণ্য? তবে বেচ আমার কাছে।’ বিকিকিনির বাজার যখন ক্রমশ জমে উঠেছে, তখন দেখি লক্ষির ঝলমলানিতে সরস্বতির ছায়া অপসৃয়মান। বাঙালি মধ্যবিত্ত মন। অতএব খানিক থমকালাম। ইত্যবসরে, আমেরিকা বললে, ‘আহা পড়তে চাও? এ আর বেশি কি? খেতে দেব, শুতে দেব, ঝোলা ভরা ডিগ্রি দেব। চলে এস।’ অতএব আবার ইমিগ্রেশন, ভিসা, ইত্যাদি ইত্যাদি। এসে দেখি রামঃ। এ তো যে দেশ, সে দেশই। আমার ভর্তি ঘর নিঃস্ব করে রাসেলের কসমিক লোনলিনেস হাঁ-মুখে দণ্ডায়মান।
বয়েসের সাথে সাথে ভয়টা কমে গেছে। বুদ্ধদেব বসুর ‘উত্তর তিরিশ’ পড়ার পরে যেমন হয়, তেমনি অবস্থা। ফাঁক ভরাট করার দায়কে ছুটি দিয়েছি। একাকিত্ত্ব বন্ধু হয়ে আসে মাঝে সাঝে।
ঘরটা অদ্ভুত। জানলাটা প্রায় ছফিট উচ্চতার থেকে শুরু হচ্ছে। মাথা উঁচু করে দেখলে বাইরেটা দেখা যায়। সাদা হয়ে আছে পথ ঘাট, বাড়ি ঘর। বরফ পড়ছে পরশু থেকে। আমি টপোলজি পড়ছি রসিয়ে। যখন তখন পড়ছি। যখন তখন ডিগবাজি খাচ্ছি। ছুটির মরসুম। বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে এখনো দশ দিন বাকি।
কখনো একা লাগলে একাই থাকছি। বসে আছি চুপ করে। ভাবছি যে ফাঁক ভরাট করতে করতে কখন যেন শিল্পী থেকে কর্মকার হয়ে পড়েছি। জীবনের শিল্পী থেকে জীবনের কর্মকার। মন ভুলাতে ভুলাতে, কখন যে অন্ধ হয়ে গেছি, সিধা দেখতেই ভুলে গেছি তার খেয়াল নেই। এখন যখনই ফাঁক দেখি, হাত নিশমিশ করে ভরাট করার জন্য। কে যেন ভয় দেখিয়েছে যে জীবনে যদি এতটুকু ফাঁক থাকে, এতটুকু যদি অমসৃন ক্লেশ থাকে, তা হলেই তুমি ক্লাসের বাইরে।
আপাতত মিলওয়াকি শহরে সন্ধ্যে ছ’টা। পাশের ঘরের কোরিয়ান ছেলেটি বোধহয় ল্যাপ্টপে সিনেমা দেখছে। টুঙটাঙ শব্দ পাচ্ছি। আমি চেয়ারে বসে বসে যেমন তেমন লিখে চলেছি। জানলা দিয়ে তেরছা ভাবে আকাশের লাল ভাবটা জানান দিচ্ছে বাইরে প্রচুর আলো। হ্যাঁ, আকাশ লাল মানেই বৃষ্টি হবে নয়, আকাশ লাল মানে মানূষের তৈরি বিদ্যুৎএর ঝলকানি ঠিকরাচ্ছে দিগন্তে।

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: