এখানে আকাশ নীল। শরৎ কালে আমার দেশে যেমন মেঘ দেখা যায়, এখানেও তেমনি মেঘ। আমার ঘরে একটা বিছানা আছে। বড় চৌকো মত বিছানা। উবু হয়ে শুয়ে থাকলে, জানলা দিয়ে হয়ত খানিকটা মেঘ দেখা যাবে। কখনো দেখিনি।

আমার দেশের ঘরে, দু কামরার ফ্ল্যাটের ভেতর ঘরে, একফালি বিছানা ছিল। তখনও জানলা গুলো কাঁচে ঢাকেনি কেউ। কালো সিমেন্টের মেঝে টাইলসে বাঁধা পড়েনি। দুপুরবেলায় ভীষণ মন উসখুস করলে, দেহটাকে বিছানায় চেপে ধরতাম উবু হয়ে। গ্রীষ্মের প্রখর রোদ আমার জানলার ফাঁক ফোকর দিয়ে ঘরে ঢুকত। হঠাৎ উবু হওয়া চোখে দেখতাম, রোদের তেজ কমে এসেছে। জানলার পাখনা দিয়ে একটা মেঘ কেমন করে যেন ছায়া এনে ফেলেছে। একটু খানি ছায়া। হাতের চামড়ার ওপর জানলার রড গুলো ফালি ফালি আঁধার ঘনিয়ে দিত। সে গ্রীষ্মের দুপুর হঠাৎ যেন শ্রাবণের শেষ দিগন্ত।

মাঝে মাঝে বৃদ্ধ যুবক রেগে যেত খুব। কেমন করে সে ছেলেবেলায় এই শহরে এসেছিল, কেমন করে নিতান্ত দারিদ্রের মধ্যে দিয়ে তার অনমনীয় জেদ তাকে হারতে দেয়নি, সেইসব কথা বার বার বলত চিৎকার করে। ‘তোমরা শোনো, তোমরা জানো, এই আমি একদিন ফুটপাতে শুয়েও রাত কাটিয়েছি। এক রিকশাওয়ালার দয়ায় জুটেছে শুধু দুমুঠো ছাতু। সেইটুকু খেয়ে দিনের পর দিন কলেজে গেছি খালি পায়ে। বন্ধুদের টিটকিরি হোক বা ধু ধু করা ক্ষুধার জ্বালা, কোনওকিছুই আমায় হারাতে পারেনি। একবারে আইন আর বারকাউন্সিল পাশ করেছি। নিজের জোরে পশার জমিয়েছি কোনও মুরুব্বির পরোয়া না করে।’

বলতে বলতে বৃদ্ধ যুবকের শিরা উপশিরা ফুলে ফুলে উঠত। আমি চুপ করে শুনতাম।

বিছানার ঘাড় গুঁজে ছায়ার মধ্যে কিত কিত খেলতে খেলতে, হঠাৎ দুপুর নাগাদ বাইরে খটরমটর আওয়াজ। তড়াক করে উঠে জানলার রডে গাল চেপে দেখতাম। পুজোর বাঁশ এসে গেছে যে! মুটেরা বাঁশ গুলো ট্যাঙ্কের ধারে ফেলছে। তারই আওয়াজ হচ্ছে। ছুটে বেরিয়ে যেতাম বাইরে। নৌকা নৌকা খেলতে হবে যে। বন্ধুরা আসত হুড়মুর করে নেমে। দিন যেত, হপ্তা যেত, নারকেল দড়ি দিয়ে কোন ময়দানবের ইন্দ্রজালে প্যান্ডেল গড়ে উঠত। আমরা প্যাণ্ডেলের আনাচে কানাচে চড়তাম। কে কত উঁচুতে উঠতে পারে তার প্রতিযোগিতা। হাত ছড়ত, পা ছড়ত। কখনো বা পড়ে গিয়ে পা ভাঙত। রোদ্দুরের তাতে, মেঘের ছায়ায়, শরৎকাল আবছা হয়ে ভেসে যেত আমাদের সঙ্গে। আমরা আর বড় হতাম না।

বৃদ্ধের ছিল ইয়া মোটা মোটা ডিকশনারি। ইংরেজি শেখার তার খুব শখ। আমায় মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করত, ‘বলত insatiable মানে কি?’ হয়ত আমি জানতাম, কিন্তু বলতাম না।

‘কি মানে দাদু?’

বুড়ো মহা উৎসাহে আমায় ইংরাজি শব্দের ভাঙা গড়া শেখাতে বসত।

সকাল দশটা বাজলে আসত ইশাকদা। মা বলত ‘ইশাকদা’, অতএব আমিও। দাদুর মুহুরি ছিল সে। জয়নগর থেকে আসত ট্রেনে চেপে। একটু খুঁড়িয়ে হাঁটত। ইশাকদা এলে প্রথমেই চা আর জলখাবারের জোগাড় হবে। আর হবে সেই অচেনা গাঁয়ের আটপৌরে গল্প গুজব। দিদুর এসব গল্প ভারি পছন্দের ছিল। এ গল্প সে গল্প, এ কথা সে কথা। গল্পের চোটে সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে যায় যায়। দাদু রেগে যেত তারপর। এত দেরি করলে কোর্টে কখন যাবে! সব কেস নষ্ট হবে তো।

তারপর একদিন পুজো শেষ হয়ে গেল। শরীরটা বিছানার কোটরে চেপে রেখে ছায়ার খেলা দেখতে দেখতে হঠাৎ বাইরে প্রচণ্ড কোলাহল। কোথায় যেন যেতে হবে। কি সব যেন করতে হবে। কেন যেন খুব, খুব, খুউব দুরে যেতে হবে সকলকে। আমাদের দু কামরার ফ্ল্যাট ফাঁকা হতে হতে ফাঁকা হয়ে গেল। যা কিছু অগোছালো ছিল, ঘিঞ্জি ছিল, পালটে গেল সবটা। জানলার ওপর কাঁচের খাঁচা। সিমেন্টের এবড়োখেবড়ো মেঝে চেপে ফর্সা ঝকঝকে টাইলস। পুজোর প্যাণ্ডেল, ত্রিপল, আজগুবি কোন ম্যাটাডোরে।

বাইরে প্রচণ্ড কোলাহল। খুব দুরে যেতে হবে বলে খুব দুরে এসেছি।

দাদু আজ মারা গেছেন।

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: