(এর আগে ‘কলকাতা ১‘ এ লিখেছি “কলকাতায় থেকে অর্থ এবং বিদ্যা উপার্জন করা সহজেই সম্ভব। আর ব্যস্ততার ভনিতা ছাড়া হয়ত কিছু ভাল কাজও সম্ভব।”)

কলকাতা ২ (তিরিনফুক গ্রাম)

“শোন ভ্যালুলেস বোকা বোকা সব কথা বলিস না। পাড়ার ফুলকাকিমা কবে মাথায় হাত বুলিয়েছে, মানিকতলার রমজান চাচা কবে চিতলের পিঠ চাঁছতে চাঁছতে, দুটো গাই গরুর গপ্পো করেছে এসব বলবি তো? টিপিক্যাল সেন্টিমেন্টাল ন্যাকামো। ভাই এটা টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি …” অভিজিৎদা ড্রাইভ করতে করতে উত্তেজিত হয়ে পড়ল। ডালাস থেকে অস্টিন যাওয়ার পথে রোজ জ্যাম থাকে। আজ আবার কি একটা ওয়েদার এল্যার্ট চলছে। 

আমারও রাগ হল একটু। আরে ভাই ফেসবুকে কত হিপোক্রেসিই তো চলছে। আর আমি দুকলম ভ্যান ভ্যানে গদ্য লিখলেই খিস্তি শুনতে হবে? 

দিলাম ইন্টারনেটটা অফ করে। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। আষাঢ় মাসের সন্ধ্যা। হাঁটতে হাঁটতে উঠে এলাম সেন্ট্রাল এভিনিউতে। দেড়শো মিটারের হাঁটা পথ। কিন্তু শুধু দেড়শো মিটার নয়। 

ফ্ল্যাট থেকে নেমেই ফুলকাকিমার সাথে দেখা । 

‘গাড়ি এত জোরে চালাস কেন বাবা? শুনছি তুই বিদেশ বিভুঁয়ে যাবি। না না এ মোটেও ঠিক কথা নয়।’ 

আমায় আশ্বস্ত করতে হয়, “আচ্ছা কাকি। আস্তেই চালাবো এবার থেকে।”

দু পা হাঁটতেই ফ্লাইং সসার খেলছে ছেলে মেয়েরা। 

“দাদা কবে বেড়াতে নিয়ে যাবে?” 

“তোরাই বল? সামার ভ্যাকেশন তো শেষ তোদের নাকি?” 

“তুমি রবিবার ফ্রি?”

বিল্ডিং থেকে বেরোনোর সময় আবার পিছুটান,”অনিদাদা খেলবে নাকি?” এবার একদম কচিদের ক’জন। আমি মাঝে মাঝে ওদের সাথে লুকোচুরি খেলি কিনা। 

“না রে, একটু বেরোচ্ছি। পরে একদিন খেলব।”

“তুমি তো রোজ ‘পরে পরে’ বলো”। 

ওদের রাগ হওয়াটা অন্যায় কিছু নয়। মান ভাঙাতে একটু খেলতেই হল। 

হাউসিং থেকে বেড়িয়ে পড়লাম। বাঁদিকে ছট্টুর পিৎজার দোকান। ডান হাতে সিংজীর চায়ের আড্ডা। 

ঘর থেকে এই অবধি হাঁটা পথ যেন পিচ রাস্তাই নয়। যেন সে এখনো অপাপবিদ্ধা। যেন তার দুপাশে অগোছালো সব বন্য ফুলের ঝোপ। তার ফাঁকে ফাঁকে পাতার কুটির। আর বেত বনের অনন্ত সময়। 

কখনো বেত বন দেখেছ? পুরোনো দিনের গল্পে, উপন্যাসে, বেত দেখা যেত মাস্টারদের হাতে। সেই বেত ছিল ভয়াবহ। অথচ গ্রাম দেশে, বেতবনের একটু অন্য গৌরব আছে। 

মনে করো তুমি মৌরি নদীর তীরে সেই নাম না জানা আভীরপল্লিতে জন্মেছ। আষাঢ়ের অপরাহ্ন। অথবা আশ্বিনের গোধুলিবেলা। বাগদিপাড়ার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কনকচাঁপা গাছটা রোজই তোমার চোখে পড়ে। তুমি দাঁড়াও না বটে। কিন্তু ঠাহর করে দেখতেও ভোলো না। 

দাঁড়াবে কেমন করে? বেতের বনে তোমার আগেই যদি সে পৌঁছে গিয়ে থাকে? বেতসকুঞ্জে, সেই নুয়ে থাকা নিভৃত গোপন কুটিরে? এইসব গোপন কুঠুরি কেমন করে না জানি গড়ে উঠেছে প্রকৃতির নিয়মে। জমি টুকু সাফ সুতরো করে তোমরা তৈরি করে নিয়েছ তোমাদের নিজস্ব স্বর্গ। তোমাদের নিজেদের গ্রাম।  

তুমি কোন শহরে থাকো? তেরোতলার ফ্ল্যাটে ওঠার সময় লিফটে অচেনা কারোর সাথে রোজ দেখা হয়ে যায়? সে কি তোমার পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে। এত বছর একসাথে থেকেও চিনে ওঠা যায়নি?

তুমি কোন শহরে থাকো? যেখানে ঘরে অতিথি আসা মানে সপ্তাহান্তে মদ্যপানের আসর? ভীষণ রকম একলা হয়ে ওঠা মানুষগুলো নিঃঝুম?

এই উত্তর কলকাতার বুকে, এই ব্যস্ত শহুরে জীবনে, গ্রাম এখনো বেঁচে আছে। আমি দুনিয়ার যে প্রান্তেই যাই না কেন, যখন ঘরে ফিরি, মনে হয়ে আমি আমার বেতসকুঞ্জে ফিরছি। পাতার কুটিরে ফিরছি। যেখানে মানুষ মানুষকে চেনে। দুদণ্ড দাঁড়িয়ে কথা বলার বিলাসিতা দেখাতে পারে। এখনো সপ্তাহান্তের  বিয়ার পার্টি অথবা লাউড স্পিকার দিয়ে যেখানে একাকিত্ত্বের ফাঁক ভরতে হয় না। 

কলকাতায় এসো। তোমার বন্ধু, আপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই তোমায় জানলা দিয়ে ডাকতে আসবে, ‘কি রে… কি করছিস।’ 

এরপর কলকাতা ২ ১/২ (উত্তরাধিকার) 

Join the Conversation

2 Comments

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: