সত্যি ভুতের গল্প

এবার পাড়ায় পুজো হচ্ছে না। বড়রা সব ঝগড়া করে বসে আছে। ছোটরা বেজায় ব্যাস্ত ইস্কুল কলেজ নিয়ে। খারাপ লোকরা সব খারাপ কাজ করছে নিয়ম করে। কিন্তু ভাল মানুষেরা তাদের মোটেই বাধা দিচ্ছে না।

এত বছরের পুজো, একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে? বাধ্য হয়ে শুক্লা পঞ্চমীর রাত্তিরে, রাধাচূড়া গাছের ডগায়, ভুতেদেরই মিটিং ডাকতে হল। একটা ব্যবস্থা তো করা চাই।

বিজয় মুখোপাধ্যায় ডাকসাইটে ডাক্তার। যত কাল বেঁচে ছিলেন, পুজো কমিটির সেক্রেটারি পদ তার জন্য বাঁধা থাকত। ডাক্তার মানুষ, লোকে সচরাচর ঘাঁটাতে চাইত না। কখন রাত বিরেতে দরকার পরে বলা তো যায় না। তার ওপর নিয়মিত মুগুর ভাঁজা চেহারা। এতো একালের প্রোটিন শেক খাওয়া বাইসেপ নয়। কানাঘুষোয় শোনা যায়, সে কালের দুঁদে গুণ্ডা, হাতকাটা হাবুলকে নাকি এইসা ঘুষি মেরেছিলেন, সে ও তার গুষ্টি আর এই পাড়ায় কোনওদিন ঢোকার হিম্মত পায়নি।

গলা খাঁকারি দিয়ে বিজয় ডাক্তার বললেন, ‘ওই মাণ্‌কেটার ঘাড় মটকালেই সব সমস্যার সমাধান। বেটা নিজেও কোনও কাজ করবে না, দিবারাত্র বসে থাকবে, আর কেউ কিছু করতে এলেই বাগড়া দেবে।’

‘আহা বিজয়! সবতাতেই মেজাজ গরম করলে চলে?’ প্রাণেশ্বরজেঠু একটু হাওয়া ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করলেন। তিনি পাড়ার প্রবীণ ভূত। ছবি আঁকতেন, ছবি আঁকা শেখাতেন। তদুপরি ভুত কমিটির প্রেসিডেণ্টও বটে। কেউ গরম হলে তাকে ঠাণ্ডা করা, আর কেউ নরম হলে তাকে শাসন করাই তার কাজ।

এইরকম নরম গরমে ভুতেদের মিটিং প্রায় ভোররাত অবধি চলল। কি হল সে মিটিং-এ অবশ্য বলা বারণ।

বকুলপিসী অভ্যাস মত ভোররাতে ফুল তুলতে বেরিয়েছেন। আজ আবার ব্রত আছে। শিউলি ফুল চাইই চাই। বয়েস হয়েছে পিসীর। আজকাল চোখে তেমন ঠাহর পান না।

ফুল গাছ গুলো পিসীকে জন্ম থেকে চেনে।

পুরোনো ফুলেরা মাথা নুইয়ে দেয় পিসীর আঙুলের কাছে। আহা, ঝরে পড়ার আগে পিসীর পুজার কাজে লাগলেই বরং ভাল। মাঝে মাঝে বকুলপিসী সদ্য ফোটা ফুল ছিঁড়ে ফেলেন ভুল করে। গাছেদের খুবই লাগে। কিন্ত পিসীকে তারা কিছু বলে না।

শিউলি গাছের তলাটা আজ কেমন ভিজে ভিজে। পিসীর আঙুলে কটা ফুলের পাপড়ি ঠেকলো। শিউলি ফুলের স্পর্শ তো এমন হয় না। পিসী আলতো করে ফুলটা তুলে নিলেন। কি সুন্দর রঙ! প্রায় অন্ধ চোখেও রঙের দিপ্তি এসে সব আলো করে দিচ্ছে। লাল রঙ, বেগুনি রঙ, সবুজ রঙ। এক ফুলে এত রঙ? বকুলপিসী আস্তে আস্তে ফুলটা নাকের কাছে নিয়ে এলেন। আহ! কি সুন্দর গন্ধ। প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল।

মাণিক সান্যাল বাজারে যাচ্ছিলেন। পথে কৃষ্ণ সামন্তর সাথে দেখা। ‘কি ভায়া, কালকের পুজোর মিটিং-এ নাকি জোর গণ্ডগোল।’

‘আরে ছাড়ো তো। বারোয়ারি পুজো, আর প্রশ্ন করলেই পুজো কমিটি যদি চটে যায় তা হলে কে কি করতে পারে?’

কৃষ্ণ সামন্ত, মাণিককে বিলক্ষণ চেনে। মাণিক যে সোজা সরল প্রশ্ন করেনি এও সে ভালো করেই জানে। কিন্তু পাড়ায় একটা গোলমাল পেকে থাকলেই কৃষ্ণ সামন্তর ভালো লাগে। অতএব সে আপাতত মাণিকেরই পক্ষে। যাক একটা ঝামেলা বেঁধে। কাজ কর্ম তো কিছু নেই। একটু মজা পাওয়া যাবে।

বিশ্বাসদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল, এমনি সময় পিছন থেকে বকুলপিসীর গলার আওয়াজ পাওয়া গেল, ‘বাবা মাণিক, বাজারে যাচ্ছিস নাকি বাবা?’

‘এই রে, সেরেছে। নিশ্চয় কিছু আনতে বলবে।’ মাণিক সান্যাল একটু ভুরু কুঁচকেই ফিরে তাকালেন। ‘না পিসী। এমনি দাঁড়িয়ে কথা কইছিলাম।’

‘মিছে কথা কেন বলিস বাবা। বাজারের থলি হাতে সকাল ন’টায় কেউ কি এমনি কথা কয়। এত বয়েস হল মাণিক, তবু তোর দুষ্টুমি গেল না। আচ্ছা শোন বাবা, আজ আমার ব্রত ছিল। তার প্রসাদী ফুল।’  পিসী হাত বাড়িয়ে দিলেন।

মাণিক আর কৃষ্ণ সামন্ত দুজনেই হাত পেতে নিল। নিয়েই অবাক হলে। এতো গোটা ফুল নয়। দুটো পাপড়ি মাত্র। পাপড়ির রঙ কেমন অদ্ভুত। লাল, নীল, সবুজ, আরও রাজ্যের রঙ যেন খেলা করছে। সূর্য্যের আলো পড়ে রঙ গুলো আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

‘এ আবার কি ফুল, পিসী?’ মুখ তুলেই কৃষ্ণ সামন্ত দেখল যে বুড়ি চারধারে কোত্থাও নেই। রঙটা এমন অদ্ভুত যে প্রাণে ধরে সে পাপড়িটা ফেলতেও পারল না। মাণিক সান্যালও পাপড়িটা পকেটে রেখে দিলে। ‘অনেক বেলা হয়ে গেছে। দেখি বাজারে কিছু অবশিষ্ট রইল কিনা।’

তারপর দিন থেকে মাণিক সান্যাল, কৃষ্ণ সামন্ত এবং আর পাঁচটা ঝামেলাপ্রিয়, কর্মহীন, মানুষকে আর পাড়ায় দেখা গেল না। দারোয়ান শিবচরণকে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে যে মাণিক সান্যাল তার চিটেগুড়ের ব্যবসার সাথে সাথে নতুন ইস্পাত কারখানা খোলার চেষ্টায় দিবারাত্র পরিশ্রম করছে। ভোরবেলা সে বেরিয়ে পড়ে, গভির রাতে ফেরে। কৃষ্ণ সামন্তর ঘরেও অশান্তি আর নেই। সে নাকি নতুন করে কম্পিউটার শিখছে। হার্ডওয়ার-এর ব্যবসা করতে চায়। আর বাকি ক’জনও এমনি ধারা কাজে কর্মে ভীষণই ব্যস্ত। সবার মনে হঠাৎ করে যেন একটা উদ্দীপনা জেগেছে।

‘যতটুকু জীবন আছে, ততটুকু প্রাণ ভরে পরিশ্রম করতে হবে। নতুন কিছু করতে হবে, তবেই না বাঁচার মজা।’ এমন কথা নাকি মাণিক সান্যাল বিল্টুকে বলেছে গত রবি বার। পাড়ার পাঁচটা লোক নাকি মাণিক আর কৃষ্ণর ব্যবসায়ে টাকাও ঢেলেছে। বকুলপিসীর ভাষায়, ‘আহা ওরা তো এখনও ছোট। কাজ কম্ম করলেই তো প্রাণে ফুর্তি থাকবে, পেটে খিদে হবে।’

এদিকে পাড়ায় এবারও যথারীতি পুজো হচ্ছে। প্যাণ্ডেল বাঁধার বাঁশও এসে গেছে। শুধু বোধনের অপেক্ষা।

রাধাচূড়া গাছের ডালে প্রাণেশ্বরজেঠু আর বিজয় ডাক্তার পা দুলিয়ে বসেছিল। জেঠুর ঠোঁটে মৃদু হাসি, ‘বুঝলে বিজয়, কাজ না থাকলে ভাল মানুষও খারাপ হয়ে পড়ে।’ তার হাতে সেই ফুলটা। চাঁদের আলোয় ফুলের রঙ গুলো যেন পালটে পালটে যাচ্ছে।

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: