রোক

স্লাভিনিয়ার ছেলে রোক। হাইড পার্ক ইন-এর লাউঞ্জে বসে রোজনামচা লিখছিলাম। ওয়াইফাই-টা একটু আলগা আসছিল। তাই ঘুরে বসতেই দেখি ছেলে মেয়ের দলে হাসি-র রোল উঠেছে। বসার আগেই দেখেছিলাম যে একগুচ্ছ ছেলে মেয়ে বসে তাস পেটাচ্ছে। আমি একধারে চেয়ার নিয়ে বসেছিলাম। ওরা সোফা আর টেবিলের দখল নিয়েছিল।

ছেলেটি আমার দিকে হাত তুলে বলল, ‘আমরা কি একটু বেশি চেঁচামিচি করে ফেলছি?’ বলা বাহুল্য অবাক হলাম। ‘আরে না না। আমার তো বেশ লাগছে। হইচই-ই তো চাই।’ আর কিই বা বলতে পারি। পুজো যে আর বেশি দেরি নেই। দু মাসও না। আর পুজোর রাত গুলোতে আমরা তো এমনিধারা হইচইই করে থাকি। তবে তাস থাকেনা বটে। ছেলেটি একটু উচ্ছল। আবার আমার দিকে এক গাল হেসে বলল, ‘আচ্ছা এই মেয়েটি একটু বেশি হাসে মনে হয় না।’ যার দিকে লক্ষ্য করে বলা, সে তো হেসেই লুটিয়ে পড়ছে। মজাটা আমাকে নিয়ে নাকি মেয়েটিকে নিয়ে ঠিক ধরতে পারলাম না। দায়সাড়া গোছের উত্তর দিয়ে নিজের কাজে মন দিলাম।

একটু পরে নৈশাহারে বেরব। গেট পেরোনোর সময় দেখি ছেলেটি হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছে। ‘শুভ রাত্রি’।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে ফিরে দেখি তাসের আড্ডা ভেঙে গেছে। আলাপ জমে গেল। ওরা স্লাভিনিয়া থেকে এসেছে। ‘সে দেশ কোথায়?’ ‘ক্রোয়েশিয়ার বর্ডারে। বিচ্ছিরি জায়গা বললে কম বলা হয়।’ ছেলেটি প্রধান আক্রোশ সে দেশের সরকারের বিরুদ্ধে। অপদার্থের দল। মনে মনে ভাবি সে কোথায় নয়। এসো একবার বঙ্গদেশে। সার্কাস কাকে বলে দেখবে। ওরা এখানে ইংরেজী শিখতে সামার স্কুলে এসেছি। বয়েস ষোল বছর। আমার বয়েস ছাব্বিশ শুনে তো ওর চোখ পুরো কপালে। ‘সেকি! তোমায় কিন্তু অনেক বড় কিংবা বুড়ো দেখায়। কম করে তিরিশ চল্লিশ।’

রোক এর সাথে একটা ছবি তুলে ফেললাম। ফেসবুকে যোগাযোগ পাকা হয়ে গেল। ওরা স্লাভ জাতির মানুষ। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট করে দিলে যে রুশ অথবা অন্যত্র যে স্লাভরা থাকে ওরা তাদের থেকে ভিন্ন। দেশ ওদের ছোট, কিন্তু প্রতি একশো মাইলে ভাষা পালটায়। ও থাকে একটা গ্রামে। ছোট্ট গ্রাম। মাত্র পঁচিশ ঘর মানুষ। আমায় তো রীতিমত নেমন্তন্ন করে ফেললে। অবশ্য আমিও সে পাট বাদ রাখিনি।

রোকের সাথে আড্ডা জমাটি হতে সময় লাগল না। ও যে মাত্র ষোল বছর বয়েসেই কোন একজনের ‘কাকা’ হয়ে গেছে! আর হ্যাঁ ওর জ্যাজ খুব ভাল লাগে। স্কুলের বাইরে ওটা শেখেও বটে। ‘জানো আমার মুসলিম মেয়েদের জন্য করুণা হয়। তারা দেখতে কি সুন্দর, অথচ অপদার্থ স্বামি জোটে তাদের। সতীনদের সাথে সংসারের ঘানিতে পিষেই তাদের জীবন শেষ।’ রোকের দীর্ঘশ্বাস কে অনুসরণ করে দেখি আমাদের পেছনেই একটি বেশ সুন্দরী মুসলিম মেয়ে বসে। বিতর্কিত মন্তব্য করতে অবশ্য রোকের আটকায় না। সে পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের ধার ধারে না। ‘জু দের আমি দু চোক্ষে দেখতে পারিনা। ভেবে দেখ প্যালেস্তাইনের ওপর কি জুলুমটাই না করছে!’ আমি একটু বলার চেষ্টা করলাম যে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রয়োজন থাকতে পারে ইজরায়েল – প্যালেস্তাইন ঝামেলাতে। রোক বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে আমার সাথে একমত হয়ে গেল, ‘ হতেই পারে। আমেরিকার মত হতচ্ছারা বদমাইস দেশ আর দুটো আছে নাকি।’

একা একাই ঘোরা ঘুরি করি। কিন্তু নতুন দেশ মানে কি শুধু নতুন বাড়ি ঘর দোর দেখা নাকি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্য হেদিয়ে মরা? স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে আমার নতুন দেশ দেখার প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে নতুন মানুষদের সাথে পরিচয় করা, ভাব জমানো। রোকের মত ছেলেপুলে আরো আরো জন্মাক। জন্মেই তারা লণ্ডন আসুক। আড্ডাপ্রিয় বঙ্গহৃদয় অপেক্ষমান।

20140810_231528

Join the Conversation

4 Comments

  1. 30-40 bochor boyos? ehe… ashanida…. kaku hye gle??
    tomar kothar sthe aami ekmat…. notun jayga mne notun sobkichu… lok jon, ghor dor, khawa daoa, riti niti, ……ei jonnei amay bidesh eto tane… btw, tomar online o class o chalachho okhan thke?

    Like

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: