মৈনুদ্দীন

কলকাতা এয়ারপোর্ট অনেক পালটে গেছে। ২০০৮ সালে শিকাগো – দিল্লী হয়ে কলকাতার আকশে যখন ফিরেছি, এয়ারপোর্ট দেখে মনে হয়েছে যেন বাংলার গ্রাম। ২০১৪ তে গ্রাম আর গ্রাম নেই। শহর হয়ে উঠেছে।

এ ক’দিনেই ম্যাক-টার সাথে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়েছে। ভাবটা এমন যে তাকে ছাড়া যেন চলবেই না। পুর্বতন ল্যাপটপটা নিয়ে অবশ্য এয়ারপোর্টে বসে লেখার কথা ভাবতেই পারিনা। এক তো একটু ব্যবহার করলে ব্যাটারি হাঁপিয়ে উঠবে। আর অত্যধিক গরম হয়ে যাওয়া, হ্যাঙ্গ করে যাওয়া এসব তো আছেই।

এমিরেটস-এর টিকিট। এখান থেকে দুবাই। দেড় ঘণ্টা বিরতি দিয়ে দুবাই থেকে লণ্ডন। এখন সকাল ন’টা। লণ্ডনে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা (লণ্ডনের সময়)। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ফারাক হিসেব করে, মোট ষোল ঘণ্টার যাত্রা কাল। আমি ইকোনমি ক্লাসের টিকিট কিনেছিলেম। বোর্ডিং পাস দেওয়ার সময়, টিকিটটা বিজনেস ক্লাসে আপগ্রেড করে দিল। বাপের জন্মে ইকোনমি ক্লাসের উপরে উড়োজাহাজে সফর করিনি। অকস্মাত প্রোমোশনে অতএব মন খুশ।

আগের প্যারাগ্রাফটা লাউঞ্জে বসে লিখছিলাম। এখন কিন্তু জাহাজের মধ্যে খানে বসে। ১২ নম্বর গেটে দিয়ে ইকোনমি ক্লাসের লম্বা লাইনকে রাজকীয় ঔদাসীন্য দেখিয়ে ১৩ নম্বর গেট দিয়ে দিব্যি গটগট করে ঢুকে পড়লাম বিজনেস ক্লাসের খোপে। বসার জায়গা এখানে দিব্যি আরামদায়ক। একবার আইনক্সের ইনসিগনিয়া ক্লাসে সিনেমা দেখেছিলাম। বোতাম টিপলে পা তোলার জায়গা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সিট বিভিন্ন কোণে বেঁকে যাচ্ছে। একটা বাতি আছে সিটের সাথে। সেটাকে জ্বেলে দিলে শুধু আমার কোলে আলো পড়বে। বাতির ঘাড় যেমন খুশি বেঁকানো যায়।

আমাকে এক গ্লাস আপেলের রস আর ওয়াইনের একটা তালিকা দিয়ে গেল। মধ্যবিত্ত বাঙালি যে কোনও মেনু পেয়ে প্রথমে দামের ঘরে চোখ রাখে।  অথচ এ মেনু তে দামের কোনো নাম গন্ধ নেই। তাহলে কি মুফতে মিলিবে? শ্যাম্পেন থেকে রেড ওয়াইন?

হাতিবাগানে দর করে ফতুয়া কিনি। এতটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। বিমান পরিসেবিকাকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, ‘কার্ড এ দাম দেব?’ কি আশ্চর্য্য! মূল্য দিতে হবে না! সেবিকা আবার স্পষ্ট করে বললেন, ‘যা খুশি, যতবার খুশি।’ বেশ কথা। খোদা দেন যখন ছপ্পর ফুঁড়েই দেন। শ্যাম্পেন অর্ডার করে দিলাম। মদ্যপানে যদিচ আমার আসক্তি নেই, তবু মাগনায় শ্যাম্পেন পেলে ছাড়ে কেডা? জিন্দেগীতে প্রথমবার এহেন সোমরস চেখে দেখছি। এবং বলতে দ্বিধা নেই, খেতে দিব্যি।

এত সব ঘটনার ফাঁকে মৈনুদ্দিন কিন্তু হারিয়ে গেছে । বেমালুম উবে গেছে মগজ থেকে। বর্ধমানের গণ্ডগ্রাম থেকে কে জানে কেন সে দুবাই যাত্রা করেছে আজ। এই বিমানেই সে কোথাও আছে। সে কি নিরক্ষর? না তা বোধহয় নয়। নাম তো নিজের হাতেই সই করলে। তাও আবার ইংরেজীতে। কিন্তু ইমিগ্রেশনের বাকি ফর্মটা আমাকেই লিখে দিতে হল। মৈনুদ্দিন কি সেই অগণিত ভারতীয় এবং বাংলাদেশি ভাগ্যান্বেষিদের একজন যারা আরব সাগর পাড়ি দেয় জীবিকার সন্ধানে?

বছর পাঁচেক আগে টেক্সাসের এক প্রান্তে এরকম এক বাংলাদেশী ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হয়েছিল। আমি যাচ্ছিলাম ম্যাগনোলিয়া হয়ে ডালাস। গ্যাস (পেট্রোল) নিতে দাঁড়িয়েছি। সঙ্গী মার্কিণ বন্ধু গ্র্যাণ্ট। সহসা কাউণ্টারের পেছনে বিশুদ্ধ বাঙাল বচন। এগিয়ে গেছিলাম আলাপ করতে। ভদ্রলোক আমায় গ্রীষ্মাবকাশে ফিরে আসতে বলেছিলেন। গ্যাস স্টেশনে কাজের ব্যাবস্থা হয়ে যাবে। সে অবশ্য যাওয়া হয়নি। তবে আজ এয়ারপোর্টে মৈনুদ্দিনকে দেখে কেন জানি তার কথা মনে পড়ল। মৈনুদ্দীন হয়ত জানেনা যে কাতারে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি পর্বে যে হাজার হাজার ভারতীয় শ্রমিক খেটেছে তারা অনেকেই এখনও বেতন পায়নি। জানলেও সে কি এই বাংলায় থেকে যেত? কে জানে। স্বদেশে এযুগে এক ভয়ানক মাৎসান্যায় চলছে।

গ্যাটউইক এয়ারপোর্টে নামার পর লণ্ডনের হ্রদপিণ্ডে পৌঁছনোর জন্য আরো ঘণ্টাখানেকের রেলযাত্রা আছে। স্মল হাইড পার্ক ইন-এ আজ রাতের রিজার্ভেশন। ছ’জন নারী পুরুষের ডর্মেটরী। জানিনা কেমন হবে। লণ্ডনে দিন দুয়েক থাকার পর অক্সফোর্ডে যাওয়ার সাধ আছে। তার পর তো স্কটল্যান্ড আছেই। যাত্রা শুরু।

Join the Conversation

2 Comments

  1. eta diei strt krlm pora….. tomar blog bhlo ki kharap sei nie ami konodin kichu bolbo na, but eta chaibo je tomar lekhoni jeno cholte thake…. onko toh onekei krte pre… kintu onko krte gie nijer char pash take valo kre dekhte pare kojon?? p.s. mainuddin er byapare aro janar ichchha roilo

    Like

Leave a comment

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: